Articles Comments

সরলপথ- الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ » কুরআন হাদীস, সমকালীন অপ্রিয় প্রসঙ্গ » সুন্নাহ সম্পর্কে সাহাবীদের দৃষ্টিভঙ্গী

সুন্নাহ সম্পর্কে সাহাবীদের দৃষ্টিভঙ্গী

[সুন্নাহকে মুসলিম জীবন থেকে cut off করা হচ্ছে ইসলামবিদ্বেষী সকল অবিশ্বাসী এবং ইসলামী বিশ্বের আধুনিকতাবাদী তথা প্রগতিশীলদের একটা অন্যতম লক্ষ্য! কারণটা খুব simple: সুন্নাহ্ না থাকলে, ইসলামেরই আর কোন অস্তিত্ব থাকবে না।এই ব্লগেই সুন্নাহর গুরুত্ব নিয়ে অনেক কয়টা লেখা লাগানো রয়েছে। আজ আমরা ইনশা’আল্লাহ্ দেখবো যে, সাহাবীরা (রা.) সুন্নাহকে কি চোখে দেখতেন! মূখ লেখা:Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]

আল্লাহর রাসূলের (সা.) পরেই যাঁরা কুর’আনের সত্যিকারের অর্থ সবচেয়ে ভাল বুঝতেন এবং একজন বিশ্বাসীর কি ধরণের আচরণ করা উচিত তা সবচেয়ে ভাল যাঁরা জানতেন, তাঁরা হচ্ছেন সাহাবা রাদিআল্লাহু আনহুম ৷ আল্লাহর রাসূল (সা.) নিজেই তাঁর প্রজন্মকে সর্বশ্রেষ্ট প্রজন্ম বলে আখ্যায়িত করেছেন: “তোমাদের (আমার উম্মতের) মাঝে সর্বশ্রেষ্ট হচ্ছে আমার প্রজন্ম, তারপর হচ্ছে তার পরের প্রজন্ম, এবং তারপর হচ্ছে তার পরের প্রজন্ম ৷” (বুখারী ) ৷ বাস্তবিকই সাহাবীদের (রা.) মাধ্যমে আল্লাহ কুর’আনকে সংরক্ষিত করেছিলেন এবং তাদের মাধ্যমেই পরবর্তী প্রজন্মগুলো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তারিত দিকগুলো সম্বন্ধে শিক্ষা লাভ করেছিলেন ৷ নীচে আমরা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও জ্ঞানী সাহাবীদের কয়েকজনের কথা এবং রাসূল (সা.)-এঁর সুন্নাহ সম্বন্ধে তাঁদের অবস্থান তুলে দিলাম ৷

সুন্নাহ সম্বন্ধে সাহাবীদের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করার আগে, তাঁদের আচরণের একটা ব্যাপার সস্পর্কে উল্লেখ করার প্রয়োজন রয়েছে; তাঁরা হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ট ঐ প্রজন্ম যাঁরা নবী (সা.)-কে তাৎক্ষিণকভাবে অনুসরণ করেছেন – কোন একটা নির্দিষ্ট কর্ম রাসূল (সা.) কেন সম্পাদন করলেন, সে সম্বন্ধে কোন সংশয় বা প্রশ্ন উত্থাপন করা ছাড়াই ৷ উদাহরণস্বরূপ বুখারীর বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এঁর সূত্রে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি সোনার আংটি পরতেন, আর তাই লোকেরাও সোনার আংটি পরতে শুরু করলো ৷ তারপর নবী (সা.) আংটিটি পরিত্যাগ করলেন এবং বললেন, “আমি আর কখনো এটা পরবো না ৷” লোকেরাও সাথে সাথে তাদের সোনার আংটিগুলি পরিত্যাগ করলো ৷ আরেকটি উপলক্ষে নবী (সা.) সালাত আদায় করছিলেন এবং সালাতের মাঝে তিনি তাঁর জুতা খুলে ফেললেন ৷ সাহাবীরা (রা.) যখন তাঁকে ঐরকম করতে দেখলেন, তখন তাঁরা নিজেরাও তা অনুসরণ করলেন ৷ পরবর্তীতে তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন যে, তাঁরা কেন তাদের জুতা খুলে ফেলে দিলেন ৷ তাঁরা বললেন, “কেননা আমরা আপনাকে আপনার জুতো খুলে ফেলতে দেখেছি ৷” তিনি তাঁদের ব্যাখ্যা করলেন, “জিবরাইল (আ.) আমাকে জানিয়েছিলেন যে, আমার জুতোয় কিছু ময়লা লেগেছিল ৷”

সাহাবীদের এই আচরণ এবং এই বাস্তবতা যে, তাঁদের এহেন আচরণের জন্য আল্লাহ এবং রাসূল (সা.) কখনোই তাদের তিরস্কার করেননি অথবা ভুল শুধরে দেননি – এটা হচ্ছে সুন্নাহ মর্যাদার ব্যাপারে আরেকটি প্রমাণ ৷ এ ধরনের ব্যাপার: ‘আল্লাহর নীরব অনুমোদন’ – এই শ্রেণীভূক্ত হবে ৷ এটা অকল্পণীয় যে তাঁরা যদি ভুল করে থাকতেন, তাহলে আল্লাহ তাঁর তরফ থেকে এ ব্যাপারে ইঙ্গিত ছাড়া তাঁদের সে আচরণ অব্যাহত ভাবে চালিয়ে যেতে দেবেন ৷

তাঁদের কর্মকান্ড ছাড়াও সাহাবীরা সুন্নাহর মর্যাদা ও কর্তৃত্ব সম্বন্ধে তাঁদের বিশ্বাস ব্যক্ত করে বক্তব্য প্রদান করে গেছেন এমন বহু উদ্ধৃতির মাঝে নীচের উদ্ধৃতিগুলোও রয়েছে:

১)নবীর সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে সৎকর্মশীল আর তাই যিনি নবীর (সা.) পরে গোটা উম্মাহর মাঝে সবচেয়ে সৎকর্মশীল বলে বিবেচিত, সেই আবুবকর (রা.) বলেছেন, “রাসূল (সা.) যা করতেন এমন কোন কিছুই আমি করতে বাদ রাখিনি ৷ আমি ভয় পাই যে, আমি যদি তার কোন আদেশ বাদ দিতাম, তাহলে আমি বিপথগামী হয়ে যেতাম ৷”

২)সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) থেকে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি বলেন, “যারা উল্কি আঁকে, যারা উল্কি আঁকাতে চায়, যারা ভ্রু তুলে সরু করে এবং যারা আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন ঘটাতে দাঁত ফাঁক করে তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ ৷” একথা উম্ম ইয়াকুবের কাছে পৌঁছালে তিনি তাঁর কাছে আসেন এবং বলেন, “আমি শুনেছি আপনি এমন এমন কথা বলেছেন ৷” তিনি তাঁকে বললেন, “আল্লাহর রাসূল (সা.) যেটাকে অভিশাপ দিয়েছেন এবং যা আল্লাহর কিতাবে পাওয়া যায় সেরকম ব্যাপারে যদি আমি অভিশাপ দিই তাহলে আমার দোষ কোথায়” মহিলা তাঁকে বললেন , “আমি (আল্লাহর কিতাব) শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছি, কিন্তু কোথাও (আপনি যা বলেছেন) তা পাইনি ৷” আব্দুল্লাহ্‌ (রা.) তাঁকে বললেন,“আপনি পড়ে থাকলে তো আপনার পাবার কথা ৷ আপনি কি পড়েন নি ‘আল্লাহর রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করে তা থেকে দূরে থাকো’ ? (সূরা হাশর,৫৯;৭) মহিলা বললেন, “হ্যাঁ” তিনি বললেন, “তিনি [আল্লাহর রাসূল (সা.)] এসব জিনিস নিষেধ করেছেন ৷ ” এই ঘটনায় একজন সাহাবী নবীর (সা.) প্রদত্ত বিধিনিষেধকে আল্লাহর বিধিনিষেধ বলে উল্লেখ করেছেন। ঐ ভদ্রমহিলা, অর্থাৎ, উম্ম ইয়াকুব, আব্দুল্লাহ্‌কে (রা.) ভুল বুঝেছিলেন, এবং ভেবেছিলেন যে, তিনি এমন কোন সুনিদিষ্ট আয়াতের কথা বলেছেন যেখানে ঐ কাজগুলির কথা নিদিষ্ট ভাবে উল্লেখ করা রয়েছে ৷ আব্দুল্লাহ (রা.) তাঁর ব্যাখ্যায় দেখান যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা আসলে আল্লাহ যা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছেন তার মতই গুরুত্বপূর্ণ ৷ এ ব্যাপারে তাঁর প্রমাণ ছিল সূরা হাশরের সাত নম্বর আয়াত ৷

৩)সাঈদ ইবন আল-মুসাইয়্যেব থেকে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে যে, উমর (রা.) বলেন, “একজন বিধবা তার স্বামী হত্যার বিপরীতে প্রাপ্ত রক্তপণ থেকে উত্তরাধিকার হিসাবে কিছুই পাবে না ৷” আদ-দুহাক ইবন সুফিয়ান, উমর (রা.) কে বলেন যে, “রাসূল(সা.) একবার তাঁকে লিখেছিলেন যে, আস-শিয়াম আল-যাহাবীর স্ত্রীকে যেন তার স্বামীর রক্তপণের একটা অংশ উত্তরাধিকার হিসাবে দেওয়া হয় ৷” উমর (রা.) তারপর তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন ৷ এবং রক্তপণের একটা অংশ বিধবাকে দান করেন ৷ এই ঘটনা থেকে উমর আল-খাত্তাব (রা.) সুন্নাহর প্রতি কেমন মনোভাব পোষণ করতেন, তা বোঝা যায় – যিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ছিলেন এবং দ্বীনের জ্ঞান ও সঠিক ধারণার জন্য যাঁর সুখ্যাতি ছিল ৷ না জেনে তিনি এমন একটা অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, যেটা রাসূল (সা.)-এঁর সিদ্ধান্তের বিপরীত ৷ কিন্তু যখনি তিনি বুঝলেন যে, তাঁর সিদ্ধান্ত্ত সুন্নাহর বিপরীতে চলে যাচেছ, তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর মতামত পরিত্যাগ করলেন এবং আল্লাহ্‌র রাসূলের (সা.) সিদ্ধান্তের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে সমপর্ণ করলেন ৷

আরেকটি ঘটনায় যেখানে উমর (রা.) সম্পৃক্ত ছিলেন, একটা নিদিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কেননা একজন সাহাবী একটা সদৃশ ঘটনার ব্যাপারে নবী (সা.)-এঁর একটা হাদীস বর্ণনা করেছিলেন ৷ তারপর উমর (রা.) বলেছিলেন , “আমরা যদি এই হাদীস না শুনতাম, তবে আমরা একটা ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিতাম ৷ আমরা আমাদের মতামত অনুযায়ী বিচার করতাম ৷” এখানেও ইমাম শাফি’ঈ যেমন মন্তব্য করেন – উমরের (রা.) সিদ্ধান্ত নবীর (সা.) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হতো না ৷ কিন্তু যখন তাঁকে নবীর (সা.) সিদ্ধান্ত জানানো হলো, উমর (রা.) জানলেন যে, এ ব্যাপারে তাঁর আর কিছুই বলার রইলো না এবং উপরন্তু তিনি জানাতেন যে, একজন বিশ্বাসীকে অবশ্যই নবীর (সা.) সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে, এমনকি তা যদি তাঁর নিজের মতের বিপক্ষেও যায় ৷

সহীহ বুখারী ও মুসলিমের আরেকটি বর্ণনায় একটি ঘটনার কথা উল্লিখিত হয়েছে, যেখানে উমর (রা.) আল-শামে ( বৃহত্তর সিরিয়া) যাবার জন্য মনস্থির করেছিলেন, সেখানে তখন একটা মহামারির প্রকোপ দেখা দিয়েছিল ৷ এমতাবস্থায় তাঁর সাথে আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রা.)-এঁর দেখা হলো, তখন আব্দুর রহমান (রা.) তাঁকে বললেন যে, নবী (সা.) বলেছেন, “যদি তোমরা শোন যে, কোন নিদিষ্ট স্থানে মহামারী দেখা দিয়েছে তবে, সে স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করো না; এবং তুমি যদি সেই স্থানে আগে থেকেই অবস্থান করে থাকো, তবে সেই স্থান ত্যাগ করে বাইরে যেও না ৷” এটা শুনে উমর (রা.) বুঝলেন যে, তাঁর জন্য আল-শামের দিকে যাওয়াটা সঠিক হবে না, তাই তিনি মদীনায় ফিরে এলেন ৷

বুখারীতে লিপিবদ্ধ আরেকটি ঘটনায় দেখা যায় যে, ওমর (রা.) মাজুসিদের কাছ থেকে জিযিয়া কর সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকেন যতক্ষণ না আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রা.) সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, নবী (সা.) তাঁদের কাছ থেকে ঐ কর সংগ্রহ করেছিলেন ৷ এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, এমনকি রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নবীর(সা.) আদেশ ও সুন্নাহর কাছে সমর্পিত ৷ মাজুসীদের কাছ থেকে জিযিয়া কর গ্রহণ করার ব্যাপারে সংশয় থাকার দরুণ [যতক্ষণ না তিনি এ ব্যাপারে নবীর(সা.) উদাহরণ সম্পর্কে জানতে পারেন, ততক্ষণ], উমর (রা.) বর্ধিষ্ণু ইসলামী রাষ্ট্রের বাজেটের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছিলেন ৷

৪)আল- বাইহাকী ও আল-হাকিম কর্তৃক লিপিবদ্ধ সহীহ সনদে দেখা যায় যে, তাউস আসরের ফরজ সালাতের পরে ২ রাকাত নফল সালাত পড়ছিলেন ৷ ইবন আব্বাস (রা.) তাঁকে তা থেকে বিরত থাকতে বললেন ৷ তিনি উত্তর দিলেন যে, তিনি তা ত্যাগ করবেন না ৷ ইবন আব্বাস (রা.) তখন তাঁকে বললেন, “আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.) আসরের সালাতের পরে সালাত নিষিদ্ধ করেছেন [মাগরেবের আগ পর্যন্ত] সুতরাং, আমি জানিনা (তুমি যে সালাত আদায় করেছো তার জন্য) তুমি শাস্তি পাবে না পুরষ্কৃত হবে ৷

নিশ্চয়ই আল্লাহ্ বলেছেন:

“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে আদেশ দিলে, কোন মু’মিন পুরুষ কিংবা মু’মিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন কোন সিদ্ধান্ত্তের অধিকার থাকবে না ৷ কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে ৷” ( সূরা আহাযাব,৩৩:৩৬)

এই ঘটনা থেকে যে কেউ নবীর আদেশের গুরুত্বটা সহজেই বুঝতে পারবেন ৷ ইবাদতের মত একটা সৎকর্মের বেলায়ও যে কারো মনে রাখতে হবে যে, সে সম্বন্ধে নবী (সা.) প্রদত্ত নিয়ম-নীতি কি ৷ ইবন আব্বাস (রা.) তাউস-কে বললেন , “আমি জানি না তুমি পুরষ্কৃত হবে না শাস্তি লাভ করবে” – তাউস যে অতিরিক্ত সালাত আদায় করার জন্য শাস্তি লাভ করবেন তা কিভাবে হয়? তা এজন্যই যে, তিনি আসলে নবীর আদেশ অমান্য করছিলেন! এ থেকে বোঝা যায়, সকল সৎকর্ম – তা যতই উন্নতমানের হোক না কেন – গ্রহণযোগ্য হবার জন্য সেগুলোকে অবশ্যই কুর’আন ও সুন্নাহ দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে ৷

৫)আব্দুল্লাহ্‌ ইবন ওমর (রা.), রাসূল (সা.) থেকে বর্ণণা করেন যে, তিনি বলেন, “তোমাদের মেযেদের রাতে মসজিদে যেতে দিও ৷” আব্দুল্লাহর (রা.) একজন ছেলে বললেন যে, তিনি তা করবেন না ৷ এটা আব্দুল্লাহ (রা.) তাঁর ছেলেকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করলেন, তার বুকে ধাক্কা দিলেন এবং বললেন, “আমি আল্লাহর রাসূলের (সা.) একটা হাদীস তোমাকে বললাম, আর তুমি বলছো ‘না’ ৷” এই ঘটনায় আব্দুল্লাহ্‌ ইবন ওমর (রা.), যিনি সাহাবীদের মাঝে সবচেয়ে জ্ঞানীদের একজন ছিলেন, তিনি তাঁর ছেলের বুকে এইজন্য আঘাত করেছিলেন যে, তাঁর ছেলে নবীর (সা.) একটা আদেশ না মানার প্রবণতা দেখিয়েছিলেন ৷ আব্দুল্লাহর (রা.) বক্তব্য থেকে স্পষ্টত বোঝা যায় যে, তিনি এমন একটা কিছু বলছিলেন: “আমি তোমাকে নবীর (সা.) একটা বক্তব্য শোনাচ্ছি, আর তুমি ভাবছো যে, তারপরও এ ব্যাপারে তোমার নিজস্ব কোন বক্তব্য রয়েছে ৷ নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে তোমার আর নিজস্ব কোন বক্তব্য থাকতে পারে না ৷”

৬)নীচে আমরা যে ঘটনাটি উলেৱখ করবো তা বুখারী ও মুসলিমে লিপিবদ্ধ:
কাতাদাহ বর্ণনা করেন, “আমরা ইমরান ইবন হুসায়েন ও বুশায়ের ইবন কাব এ সাথে বসেছিলাম ৷ ইমরান বর্ণনা করেন যে, ‘শালীনতাবোধ হচেছ একটি পরিপূর্ণ গুণ’ অথবা তিনি বলছিলেন ‘শালীনতাবোধ পুরোটাই ভাল ৷’ এটা শুনে বুশায়ের ইবন কাব বলেন `আমরা নিদিষ্ট কিছু বইয়ে অথবা জ্ঞানের বইয়ে দেখতে পাই যে, এটা হচ্ছে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত মনের প্রশান্তি অথবা আল্লাহর খাতিরে ভদ্র আচরণ এবং এর কিছু দুর্বল দিকও রয়েছে ৷’ ইমরান এতই রাগান্বিত হলেন যে, তাঁর চক্ষু লাল হয়ে উঠল এবং তিনি বললেন, ‘আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূলের (সা.) একটি হাদীস বর্ণনা করছি আর তুমি তার বিরোধিতা করছো ৷’

আব্দুল হামিদ সিদ্দিকী এই হাদীসের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন:
“এই হাদীস একজন নবীর মর্যাদা ব্যাখ্যা করে ৷ নবীদের জ্ঞানের উৎস হচ্ছে ঐশ্বরিক ৷ আর তাই তা নিখুঁত এবং সকল প্রকার ত্রুটিমুক্ত৷ মানুষের প্রজ্ঞা পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও মতামতের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে ৷ আর তাই তা কখনোই নির্ভুল হতে পারে না ৷ এ কারণেই মানবজাতিকে সবসময়ই নবীদের আদেশ মানার তাগিদ দেয়া হয়েছে – দার্শনিকদের নয় ৷ এ হাদীস স্পষ্টতই আমাদের হাদীসের মর্যাদা সম্বন্ধেও জ্ঞান দান করে ৷ এটা হচেছ ঐশ্বরিক জ্ঞানের অংশবিশেষ ৷ আর তাই ধর্মীয় অনুভূতি সহকারে এটাকে গ্রহণ করা উচিত৷”

[উপরে উলেৱখিত হাদীসের শব্দাবলী মুসলিমের]

এ হাদীসে বুশায়ের আরবদের কিছু প্রাচীন পুস্তকের কথা উল্লেখ করছিলেন যেগুলোতে তাদের ‘প্রজ্ঞা ’ লিপিবদ্ধ ছিল ৷ কিন্তু তা যখন সর্বজ্ঞানী আল্লাহ্‌ যা নাযিল করছেনে, তার বিরোধিতা করে তখন সেটাকে কি করে ‘প্রজ্ঞা ’ বলা যায় ? রাসূল (সা.) যখন বললেন যে, এর উল্টোটাই করা সত্যি তখন সেটাকে আর কি করে ‘প্রজ্ঞা’ বলে বিবেচনা করা যায়? নবী (সা.) যখন কোন বিষয়ে কথা বলেছেন তখন সেই বিষয়ে নবীর (সা.) বক্তব্য বিরোধী কোন বক্তব্যকে কেউ কিভাবে সম্মান দেখাতে পারে? [দুভার্গ্যজনকভাবে যে কেউ এমন অনেক মুসলিম খুঁজে পাবেন যারা এমন সব ধ্যান-ধারণা অনুসরণ করেন, যা বিশেষত স্বল্পোন্নত দেশের কারো কারো জন্য, ‘বিজ্ঞান সমৃদ্ধ পশ্চিম’ থেকে আসা যে কোন কিছুই তাদের নিজেদের ‘ঐতিহ্যবাহী প্রজ্ঞার’ চেয়ে উন্নততর বলে মনে হয় ৷ এটা হয়তো একধরণের হীনমন্যতা থেকে উদ্ভূত ৷ অথচ একজন মুসলিম যে কিনা কেবল আল্লাহর ইবাদত করে এবং তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তার উচিত নয় এমন কেউ বা এমন কোন সভ্যতা যা কিনা আল্লাহর হেদায়েত বিবর্জিত – তার মুখোমুখি দাঁড়াতে গিয়ে হীনমন্যতায় ভোগা ৷]

আসলে এধরণের আরো বহু উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে, যেখানে কেউ নবীর একটি হাদীস অস্বীকার করাতে অথবা সে সম্বন্ধে কোন বিরূপ মন্তব্য করাতে তার সাথে কেউ কথা বলতে অস্বীকার করেছে ৷ সুন্নাহর স্বপক্ষে অবস্থান করতে গিয়ে এ ধরণের আচরণের কথা আমরা আব্দুল্লাহ ইবন মুগাফাল, ইবাদা ইবন আল সামতি, আবু আদ দারদা এবং আবু সাঈদ আল-খুদরীর মতো সাহাবীদের বর্ণনায় জানতে পারি ৷ পরবর্তী আলেমদের কাছ থেকেও একই ধরণের বর্ণনা পাওয়া যায় ৷ এসব দুর্ব্যবহার কেবল একভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়: নবীর (সা.) কোন বক্তব্য কোন মুসলিম বিরোধিতা করবেন অথবা প্রত্যাখ্যান করবেন – এটা অকল্পণীয় ৷ ওরকম ব্যবহারের কোন অবকাশ নেই, আর তাই পাপকার্যের জঘন্যতা অনুযায়ী তার প্রতিক্রিয়া সেরকম ছিল ৷

৭)বুখারীর বর্ণনায় এসেছে যে, আলী (রা.) ও উসমান (রা.) মক্কা ও মদীনার যাত্রাপথের মাঝখানে ছিলেন ৷ সময়টা ছিল এমন যখন উসমান (রা.) কোন নিদিষ্ট কারণবশত লোকজনকে মুতা সম্পাদন থেকে বিরত রাখছিলেন (অর্থাৎ একই নিয়তে মাঝখানে একটি বিরতি দিয়ে, হজ্জ এবং ওমরাহকে একই যাত্রায় সম্পাদন করা)৷ আলী (রা.) নিয়ত করলেন : “আমরা মাঝখানে একটি বিরতি সহ হজ্জ এবং ওমরাহর জন্য আসছি ৷” উসমান (রা.) তাঁকে বললেন, “তুমি দেখছো যে, আমি লোকজনকে এটা করা থেকে বিরত রাখছি অথচ তুমি তাই করছো?” আলী (রা.) তাঁকে উত্তর দিলেন, “আমি মানবজাতির কারো বক্তব্যে আল্লাহর রাসূলের (সা.) সুন্নাহ পরিত্যাগ করতে পারি না ৷” এই ঘটনা থেকে আবারও দেখা যায় যে, নবীর (সা.) সাহাবীরা আল্লাহ অথবা তাঁর রাসূলের (সা.) কর্তৃত্ব ছাড়া আর কারো কর্তৃত্ব মেনে নিতেন না ৷ এই ঘটনায় আলী (রা.) দেখছিলেন যে, উসমানের (রা.) ফিকহী যুক্তিতে ভুল ছিল ৷ কারণ তিনি বুঝেছিলেন যে, উসমান (রা.) মুতা সংক্রান্ত সুন্নাহকে সঠিকভাবে বুঝতে পারেন নি ৷ এখানে মনে রাখা উচিত যে, এই ঘটনার সময় উসমান (রা.) ইসলামী রাষ্ট্রের খলীফা ছিলেন ৷ এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, সাহাবীরা জানতেন যে ইসলামের ভূমিতে সর্বোচচ কর্তৃত্বের অধিকারীও, তা তিনি যতই পরহেজগার হন না কেন, তিনিও এমন কোন আইন চাপিয়ে দিতে পারি না যা নবীর (সা.) সুন্নাহর বিপক্ষে যায় ৷

সাহাবীদের সম্বন্ধে অনেক কয়টি বিশ্বস্ত সূত্রে আমাদের কাছে যে বর্ণনা এসেছে তাতে দেখা যায় যে, কোন সমস্যা দেখা দিলে তাঁরা প্রথমে আল্লাহর কিতাবে তার সমাধান খুঁজতেন ৷ সেখানে সমাধান না পেলে তখন তাঁরা নবী (সা.)-এঁর সুন্নাহয় তার সমাধান খুঁজতেন ৷ সেখানেও কোন সমাধান না পেলে তখন তাঁরা ব্যক্তিগত যুক্তির সাহায্য নিতেন ৷ প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) এবং তাঁর উত্তরসূরী ওমর (রা.) – তাদের পন্থা এবং আসলে সকল সাহাবীদের পন্থাই ছিল এটা ৷

উপরের আলোচনা থেকে আমরা নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি:

ক) (দ্বীনের জ্ঞানের ব্যাপারে যাঁরা সর্বোত্তম ও সবচেয়ে জ্ঞানী ছিলেন সেই প্রজন্ম অর্থাৎ) সাহাবীদের মাঝে এই ব্যাপারে একটা ঐকমত্য ছিল যে, নবীর (সা.) সুন্নাহ অনুসরণ করাটা তাঁদের জন্য অবশ্যকরণীয় ছিল ৷ এবং তাঁদের কেউই নিজেকে এই বাধ্যবাধকতার উর্দ্ধে বলে কখনও দাবী করেন নি ৷

খ) নবীর (সা.) মৃত্যুর পরে মুসলিমরা তখনও একমত ছিলেন যে, তাঁদের অবশ্যই নবীর (সা.) সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে ৷

গ) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে – ইবাদত থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা – সব ক্ষেত্রেই নবীর (সা.) সুন্নাহকে প্রয়োগ করতে হবে এবং এমনকি রাষ্ট্রের যিনি প্রধান, তাঁরও নবীর (সা.) সুন্নাহর বিপরীতে শাসনকার্য পরিচালনা করার অধিকার নেই ৷

Share this nice post:
Profile photo of admin

Written by

Filed under: কুরআন হাদীস, সমকালীন অপ্রিয় প্রসঙ্গ

Leave a Reply

Skip to toolbar