Articles Comments

সরলপথ- الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ » ইসলামী প্রবন্ধ, চরিত্র / আচরন, সমকালীন অপ্রিয় প্রসঙ্গ » মুসলিম জীবনে ‘সময়’

মুসলিম জীবনে ‘সময়’

লিখেছেন শায়খ এনামুল হক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ICD

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
السلام عليكم ورحمة الله و بركاته

কলেজ জীবন শেষে, আমরা, অর্থাৎ জাহাজের যাযাবর জীবন বেছে নেয়া তরুণেরা, মেরিন একাডেমীতে নিজেদের স্থান করে নিই। যারা মেরিন একাডেমীতে গেছেন, তারা হয়তো মনে করতে পারবেন যে, কর্ণফুলী নদী থেকে মেরিন একাডেমীতে যাবার জন্য প্রায় পোয়া মাইল দীর্ঘ সেতুর মত রেলিং দেয়া একটা রাস্তা রয়েছে – যা স্থলভাগকে জেটির সাথে সংযুক্ত করে। জোয়ারে এবং ভাটায়, উভয় অবস্থায় যেন মানব বহনকারী কোন জলযান সহজে ঐ জেটিতে ভিড়তে পারে, সেজন্য এই আয়োজন। জলযান-ভেড়া ঐ জেটিকে, আমরা বলতাম ‘জেটি-হেড’।

যাহোক, মেরিন একাডেমীর অপোকৃত নিঃসঙ্গ জীবনে আমাদের চিত্ত-বিনোদনের একটা ব্যাপার ছিল, বিকেলে খাবার পরে (যা সাধারণত বিকাল ৬ টার দিকে সমাধা হয়ে যেত) হেঁটে হেঁটে ‘জেটি-হেডে’ যাওয়া। এই হাঁটতে যাওয়ার পর্বটা, শীতের দিনে হয়তো খাবার আগে এবং দৈনিক গোসলের পরেই সারতে হতো – কারণ, সূর্যাস্তের পরে ওখানে যাবার কোন মানে হয় না। ঐ জেটিতে দাঁড়িয়ে সমুদ্র ও সমুদ্রে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখা যেত। আমি খেয়াল করতাম যে, ওখানে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে গিয়ে, প্রতিটি সূর্যাস্তেই আমি কেমন বিষন্ন বোধ করতাম – যদিও তখনও এর গূঢ় মনস্তাত্ত্বিক বা নৈতিক দিক নিয়ে ভাবার তেমন চেষ্টা করিনি অথবা বলা যায় তেমন অবকাশও ছিল না। সব সূর্যাস্তই হচ্ছে একটা দিনের অবসান, আর সে দৃষ্টিকোণ থেকে নববর্ষের আগের দিনের সূর্যাস্ত বা অন্য কোন বিশেষ দিনের সূর্যাস্ত ভিন্ন কিছু নয়। তবু, নববর্ষকে আমরা যেহেতু দিন পঞ্জিকায় বিশেষভাবে স্থান দিয়েছি এবং একটা বছর পার হওয়াকে আমরা যেহেতু সময়কালের একটা মাপ হিসেবে অনুভব করতে শুরু করেছি – একটা বছর শেষ হওয়াকে হিসেব তো করতে হয়ই আমাদের জীবনে। নিজের জন্মদিন অথবা নববর্ষ – দুটোর কোনটাতেই আমি কখনো উৎফুল্ল বোধ করিনি। তবে নববর্ষের আগের সন্ধ্যায়, মেরিন একাডেমীর জেটি-হেডে দাঁড়িয়ে, সূর্যটাকে টুপ করে সমুদ্রে হারিয়ে যেতে দেখে আমার হৃদয় ব্যথায় নীল হয়ে উঠেছে।

আমাদের প্রজন্মের নববর্ষ উদ্যাপন করা বলতে তেমন কিছু ছিল না – অন্তত আমরা আমাদের মধ্যবিত্ত পটভূমিতে তা কখনোই টের পাই নি (আমি আমার কৈশোরের শেষ দিকের এবং যৌবনের প্রারম্ভের দিনগুলোর কথা বলছি)। তবু, তারুণ্য বোধকরি তখনো নতুন বছরের আগমনীতে নতুন কিছু আশা করতো – কি জানি? হয়তো বা! আমি, আমার অত্যন্ত কাছের সুহৃদ-জনদেরও কখনো বোঝাতে পারিনি যে আমার কেমন লাগতো, কতটুকু কষ্ট হতো বা কেন কষ্ট হতো। অন্যদের ভিতর নতুন বছরের জন্য যে উচ্ছ্বাসটুকু দেখা যেতো, বা জন্মদিনে কেউ একটা কার্ড পাঠালে যে আনন্দের অভিব্যক্তি দেখা যেতো – নিজের ভিতরে তেমনটা অনুভব না করাতে আমি অনেক সময়ই নিজেকে নৈরাশ্যবাদী বলে সন্দেহ করেছি। কিন্তু অন্য সকল ব্যাপারে আমার মাত্রাতিরিক্ত উদ্যম দেখে নিজেকে কখনোই নৈরাশ্যবাদী বলে মেনে নিতে পারিনি। অল্প বয়সের নানা আবেগের ভিতর মনে হয়েছে, “আমি বোধহয় মানুষ নই…।” অশীতিপর কেউ ভাবতে পারে, নতুন সূর্যোদয়ে তার জন্যে কিছু নেই, কিন্তু ১৯ বছরের কাউকে তা ভাবা মানায়? আমি তখনো দ্বীন ইসলাম সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না বলতে গেলে। আমি এও জানতাম না যে, কোন মুসলিম কখনোই Passage of time সেলিব্রেট করতে পারে না!! তবু আল্লাহ্ প্রদত্ত ‘ফিতরা’ বা সহজাত বোধ থেকেই হয়তো আমার তেমন লাগতো – অথবা এও হতে পারে যে, বয়সের তুলনায় আমি তখনো অপরিপক্ক ছিলাম। প্রতিটি শিশুই নাকি মুসলিমের ‘ফিতরা’ নিয়ে জন্মায় – মা-বাবা বা পরিবেশ তাকে ইহুদী, খৃষ্টান বা কাফির বানায়।

বহু বছর পরে ২০০৪ সালের ১ লা জানুয়ারীতে আমি দেশে ছিলাম, ঢাকায় ছিলাম। আত্মীয় স্বজনের মন্তব্য থেকে বুঝেছি যে, নববর্ষের রাতে কাফির নিয়ন্ত্রিত IMF ও World Bank-এর ভিক্ষার উপর নির্ভর করা পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশের একটি এবং দুর্নীতিতে পর পর তিন বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া আমার এই হতভাগ্য দেশের মহানগরীতে, প্রলয় কাণ্ড ঘটে থাকে। নববর্ষের সময়কার ঢাকা সম্বন্ধে তাদের সেসব মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, আমাদের দেশের ‘কাফিরায়ন’ প্রক্রিয়া এখন বেশ পরিণত পর্যায়ে রয়েছে। বন্ধুর বরের সাথে নববর্ষের তামাশা দেখতে আসা জনৈকা বাঁধনের ‘বস্ত্রের বাঁধন’ যে নববর্ষ উদযাপনকারীরা আলগা করেছে, তা দেশে ফিরে লোকমুখে শুনেছি। ২০০৩-এর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যরাতে প্রলয়ঙ্করী পটকা ফুটানো এবং ছেলে-মেয়েদের মিশ্র চিৎকার শুনে বুঝেছি যে “এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই।” মাননীয় পাঠক, আমি মধ্যবিত্ত পল্লীতে বাস করি। সেখানেই এমন অবস্থা হলে, আমি অনুমান করতে পারি যে, নববর্ষ উপলক্ষে পত্রিকান্তরে ধনীর দুলাল-দুলালীদের উন্মত্ততায় যে Near pornographic বর্ণনা প্রকাশিত হয় – তাদের পরিবেশ-প্রতিবেশের অবস্থা কি! ঘুমাতে না পেরে বিরক্ত ও বীতশ্রদ্ধ চিত্তে আমি ভাবছিলাম যে, ঐ পটকার টাকা দিয়েই হয়তো সেবারকার প্রচণ্ড শীতে ঢাকার ফুটপাতে, রেল-স্টেশনে রাত্রি যাপনকারী হাড্ডিসার মানুষগুলোর হাড্ডির কাঁপুনী অনেকটা নিরসন হতে পারতো। আমি আরো ভাবছিলাম বেশ ক’বছর আগে শোনা একটা গল্পের কথা। বেশ অনেক বছর আগে এক পরিচিতির মাধ্যমে শ্রীমঙ্গলের শ্যামলী ফরেস্ট রেঞ্জে গিয়েছিলাম তথাকথিত বনভোজনে। সেখান থেকে ফেরার পথে, ঐ বনভোজী বিরাট গ্রুপের একজন – “মৌলবীর বাগান” নামক এক চা বাগানের ম্যানেজার – সবাইকে তার বাঙ্গলোয় বিকালের চা খাবার আমন্ত্রণ জানালেন। ঐ চা বাগানের ম্যানেজারের বাঙ্গলোয় চা খেতে খেতে গল্প শুনলাম যে, ঐ বাগানে নাকি এক ‘সাদা-চামড়া’ সাহেব ম্যানেজার ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। ঐ সময়কার সংশয়পূর্ণ বাস্তবতায়, বহুদিন ধরে অত্যাচারিত কুলীরা নাকি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং আক্ষরিক অর্থেই, প্রতিহিংসাবশত, তার চামড়া তুলে ফেলে। ম্যানেজার দেখালেন যে, তার বাঙ্গলোর নির্ধারিত শোবার ঘরখানি কাঠের বর্গা ও পেরেক দিয়ে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে রাখা – কারণ ওখানে কেউ ঘুমাতে পারে না। চামড়া তুলে নেয়া সাহেবের প্রেতাত্মা নাকি ঘুরে বেড়ায়। সত্যি মিথ্যা – আল্লাহু ‘আলাম (ইসলামে কিন্তু প্রেতাত্মার কোন concept নেই) । আমাদের দেশে যারা কাফির-সৃষ্ট নববর্ষ উদ্যাপন করতে গিয়ে, উন্মাদনায় মত্ত হয়ে লক্ষ লক্ষ বা কোটি কোটি টাকা ড্রেনে প্রবাহিত করেন – আমাদের দেশের শ্রমিক পিঁপড়া শ্রেণীর হাড্ডিসার মানুষেরা যদি কখনো বুঝতে পারে যে, ঐ পয়সা আসলে তাদের মজ্জা নিংড়ানো, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থকে কোন না কোনভাবে আত্মসাত করা থেকে এসেছে এবং তারা যদি তখন ঐ সব নির্লজ্জ ও বেহায়া মানুষকে জানোয়ার ভেবে তাদের চামড়ায় জুতা বানিয়ে পরতে চান ; তবে তাদের কি বিশেষ দোষ দেয়া যাবে?

কারো চামড়ায় জুতা পরতে চাইবার প্রসঙ্গে আরেকটা গল্প মনে পড়লো। এই তো সেদিন, আমার গ্রামের দিন মজুর এখলাস আলী আমাকে তার দুঃখের কথা বললেন। কাজ করতে গিয়ে একটা বাঁশের চটার বাড়ি খেয়ে, তিনি চোখ হারাতে বসেছিলেন। প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল ও পরে সেখান থেকে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে যেতে হয় তাকে। দায়-সারা চিকিৎসা সত্ত্বেও, আল্লাহর রহমতে তার চোখ রক্ষা পায়। কিন্তু কিছুদিন পরে তিনি বোঝেন যে, তার সেই চোখে তিনি ঝাপসা দেখেন। এ ব্যাপারে আবার সরকারী হাসপাতালে গেলে ‘ডাক্তর সাব’ তাকে বলেন যে, ব্যাপারটা ভালোভাবে দেখা প্রয়োজন (অর্থাৎ তার চাকুরীর আওতায় যে ভাবে দেখা সম্ভব, তা পর্যাপ্ত নয়) – সুতরাং এখলাস আলী যেন তার ‘চেম্বারে’ যান। আমাদের এখলাস আলী একদিন সকাল-সন্ধ্যা কাজ করলে বর্তমানে ১৫০ টাকা পান। এবছর দেশে ভালো ডাক্তাররা তাদের ফি ধার্য করেছেন ৪০০-৫০০ টাকা। এখলাস আলীর মাথায় এই জটিল সমীকরণ ঢোকে না যে, ঐ সব ‘ডাক্তর সাবরা’ তার মত দিন মজুরের পয়সায় পরিচালিত মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করে তবে ডাক্তার হয়েছেন। আজো তারা নামের সাথে যে প্রফেসর বা সার্জন পদবী লেখেন, তাও ঐ সব সংস্থার চাকুরীর কারণে। এই জটিল সমীকরণ যদি কেউ একবার এখলাস আলীদের বুঝিয়ে দেয়, তবে হয়তো তারা ডাক্তার সাহেবদের চামড়ায় জুতা পরতে চাইতেও পারেন!

যে কথা বলছিলাম – মুসলিম কখনো Passage of Time সেলিব্রেট করতে পারে না – মুসলিমের জন্য সময়ই জীবন। পরীক্ষার হলে বসে কেউ যদি সিনেমা পত্রিকা পড়ে সময় কাটায় এবং প্রতিটি ঘণ্টা অতিবাহিত হবার সংকেতে যদি সে আনন্দ/উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, তাকে যেমন লোকে উন্মাদ বা অপ্রকৃতিস্থ ভাবার কথা, জীবনে যারা ‘সময় হারিয়ে গেছে’ বা ‘সময় কেটে গেছে’ বলে আনন্দিত বোধ করেন, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে তাদেরও তেমনি উন্মাদ বলে গণ্য করার কথা। অন্য সব বাদ দিলেও, কেবল এই যুক্তিতেই মুসলিম কখনো নববর্ষ, জন্মদিন বা বিবাহ-বার্ষিকী নিয়ে হৈ-হুল্লোড়ে আত্মনিয়োগ করতে পারে না।

আমাদের প্রপিতামহরা, সিলেটে আমাদের বাড়ী থেকে ৫০/৬০ মাইল হেঁটে করিমগঞ্জে কোর্ট-কাচারীর কাজে গিয়েছেন। একটা সময় ছিল যখন কেউ কোন আত্মীয় বাড়ী বেড়াতে যাচ্ছেন – পথে হেঁটেই একদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। আজ সে সব দূরত্ব রকেটে নয়, বরং বাস-মিনিবাস বা মোটর গাড়ীতে করেই দিনে চারবার পরিভ্রমণ করা যায়। কি বিশাল সময়ের সাশ্রয়। একদিন আমাদের দেশ থেকে মানুষ হজ্জ্ব করতে মক্কায় গেছেন ৬ মাসের সফরে। আজ ঢাকা থেকে জেদ্দায় পৌঁছাতে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে – কি বিশাল সাশ্রয় – হজ্জ্বের এই একটি কাজের বেলায়ই ৫ মাস ২৯ দিন ১৯ ঘণ্টা সময় বেঁচে যাচ্ছে। এভাবে আপনি যদি রান্না, কাপড় কাচা বা বাজার করার মত দৈনন্দিন কাজ থেকে শুরু করে, হজ্জ্বযাত্রার মত জীবনে একবার আসা বিশেষ ব্রতগুলোর কথা ভাবেন, তাহলে দেখবেন যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আপনি অকল্পনীয় সময় বাঁচাতে পারছেন আজ। মাননীয় পাঠক, এভাবে চিন্তা করলে আপনার জীবনের ‘অর্জন’, আজ থেকে ১০০ বছর আগের একজন মানুষের জীবনের অর্জনের ১০ গুণ হবার কথা। সত্যি কি তাই হয়!!

আমরা যারা বিশ্বাসী এবং যারা উদ্দেশ্যবাদী (অর্থাৎ যারা মনে করেন য জীবনের একটা উদ্দেশ্য আছে), তারা মনে করি যে, পৃথিবী বা আরো ব্যাপক পরিসরে বলতে গেলে এই গোটা মহা-বিশ্বের সৃষ্টির পিছনে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। বস্তুবাদী অবিশ্বাসীদের কথা অবশ্য আলাদা। এমনিতে তারা প্রতিটি জিনিসের পেছনে কারণ খুঁজে বেড়ান, জীবনের সব কিছুকে ‘কার্যকারণ’ দিয়ে বুঝতে যান। আপনি যদি আপনার ধবধবে শাদা শার্টের উপর দৃশ্যমান একটা লাল দাগ নিয়ে কোন বস্তুবাদী অবিশ্বাসীর সামনে যান – তবে এটা প্রায় অবধারিত যে, সে স্বভাবগত ও মানবসুলভ যুক্তিতে আপনাকে জিজ্ঞেস করবে: “কি হয়েছে?” অর্থাৎ, সে ধরে নিচ্ছে যে, আপনার শাদা শার্টে একটা লাল দাগ এমনি এমনি ফুটে উঠতে পারে না – এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। অথচ মহাবিশ্বের সূচনার বিশাল মহা-জাগতিক ঘটনার বেলায় সে মনে করতে পারে যে, তা এমনি এমনি ঘটেছে কোন কারণ ছাড়া – অথবা মানবদেহের লক্ষ-কোটি কোষের প্রতিটিতে যে চুলচেরা নিয়ম এবং বিন্যাস পরিলক্ষিত হয়, তা সম্বন্ধে জেনেও সে ভাবতে পারে যে, মানুষের উদ্ভব ঘটেছে কাকতালীয়ভাবে কোন কারণ বা উদ্দেশ্য ছাড়া – বানর জাতীয় প্রাণী থেকে, বিবর্তনের মাধ্যমে। আমার তো মনে হয় বানর শ্রেণীর প্রাণীরা আমাদের সাথে কথা বলতে পারলে, এটুকু জানা যেতো যে, ‘এমনি এমনি মানুষ বা পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে বা তাদের উদ্ভব ঘটেছে’ – এ ব্যাখ্যাটা তাদের কাছেও গ্রহণযোগ্য নয়। এই শ্রেণীর প্রাণীকে আল্লাহ্ যেটুকু বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়েছেন, তার বদৌলতে তারাও হয়তো জেনে থাকবে যে, কোন কিছুই এমনি এমনি অস্তিত্ব লাভ করেনি – সবকিছু সৃষ্টির পিছনে একটা উদ্দেশ্য রয়েছে।

বৃটিশ বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ফ্রেড হয়েল, এই এমনি এমনি সৃষ্টির ব্যাপারটাকে খুব সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন: তার মতে, কোন প্রাণীর এমনি এমনি উদ্ভাবিত হওয়ার চেয়ে বরং কোন ‘জাংক-ইয়ার্ডের’ লোহা-লক্কড় এমনি এমনি যন্ত্রাংশে রূপান্তরিত হয়ে একটা বোয়িং ৭৪৭ এমনি এমনি তৈরী হয়ে উড়ে যাওয়াটা অধিকতর সম্ভাব্য বিষয়।
[দেখুন:page#19, The Intelligent Universe – Fred Hoyle]

তাহলে, যদি এই মহাবিশ্ব বা তার অন্তর্ভুক্ত গ্রহ-তারা-রবি বা আমরা – এই নশ্বর মানবজাতি – এমনি এমনি অস্তিত্ব লাভ না করে থাকি – যদি সত্যিই আমাদের সৃষ্টির পেছনে একটা উদ্দেশ্য থেকে থাকে, তবে সে উদ্দেশ্য কি? পবিত্র কুর’আনে একটি আয়াতে আল্লাহ্ স্পষ্টত ঘোষণা করেছেন এই উদ্দেশ্যের কথা। কুর’আনের আর কোন আয়াতে এমন স্পষ্টভাবে সে উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়নি। সূরা যারিয়াতের ৫৬ নং আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন যে, তিনি জ্বিন ও ইনসানকে সৃষ্টিই করেছেন কেবলমাত্র তার ইবাদতের জন্য । ইবাদতের অর্থ যে, কেবল নামাজ পড়া বা তসববীহ্ জপা তা নয়। ইবাদতের সাধারণ অর্থ হচ্ছে আদেশ বা নিয়ম মেনে চলা – আল্লাহ্ যে সব নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন, সে সব মেনে চলা – নির্ধারিত উপাসনা তো রয়েছেই। আপনি যখন আল্লাহর মত করে, আল্লাহর নির্ধারিত উপায়ে জীবনযাপন করবেন, তখন নিজের স্ত্রীর সাথে হাসি-ঠাট্টায় নিয়োজিত হবার মত নিতান্ত জাগতিক কাজও ইবাদত বলে গণ্য হবে – অবশ্যই, আবারো, সেই হাসি তামাশা আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত সীমানার বা কাঠামোর ভিতর হতে হবে – কাফিরদের মত, প্রায় বিবস্ত্র স্ত্রীকে নিয়ে পর পুরুষের উপস্থিতিতে সুইমিং পুলে ঝাঁপা-ঝাঁপি নয় নিশ্চয়ই!

যাহোক, কোন বিশ্বাসী যখন এটা অনুধাবন করবেন যে, তার জীবন, তার জন্ম এবং তার মৃত্যু সবই আল্লাহর এবং সবকিছ্ই আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত হওয়া বাঞ্ছনীয় – তখন তিনি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করবেন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী চলার আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। এমত অবস্থায় আপনার জীবনের আল্লাহ্ অনুমোদিত সকল কাজই ইবাদত বলে গণ্য হবে। আপনিও তখন আল্লাহকে জীবনের প্রতিটি কাজের চালিকাশক্তি বলে অনুভব করবেন। আপনি স্ত্রী-পুত্রের ভরণ-পোষণ করবেন? তাও আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে করবেন। আপনি আপনার মুসলিম ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলবেন?? সেও আল্লাহর জন্য করবেন। এভাবে আপনার জীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ড যখন আল্লাহ্ অনুমোদিত ও আল্লাহর জন্য বা আল্লাহর কথা ভেবে সমাধা হবে, তখন আপনি উপর্যুক্ত আয়াতের ‘উদ্দেশ্য’ বাস্তবায়িত করবেন। মাননীয় পাঠক! কাফিরদের কথা বলছি না আমি – কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম নামধারীদের দ্বীন নিয়ে না ভাবা, দ্বীনের কাজ না করা, জীবনে দ্বীন ইসলাম প্র্যাকটিস না করা বা দ্বীন সম্বন্ধীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ না করার পিছনে উচ্চারিত বা অনুচ্চারিত, উহ্য যুক্তিটি প্রায় সবেক্ষেত্রই হচ্ছে: “সময় নেই”। আমি এই ‘সময় নেই’ ব্যাপারটার বাস্তবতা বা সত্যাসত্য নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করেছি। প্রতিটি মানুষের জীবনের প্রতিটি মিনিট তো ৬০ সেকেন্ডেই হয় – এমন নয় যে তা আপেক্ষিক – অর্থাৎ, কারো মিনিট ৩০ সেকেন্ড দিয়ে আবার কারো বা ৯০ সেকেন্ড দিয়ে গঠিত – না তা তো হবার কোন উপায় নেই! অন্তত, যতক্ষণ আমরা সবাই এই পৃথিবীরই বাসিন্দা অর্থাৎ Space-Time-এর একই মাত্রায় অবস্থানরত। তাহলে, এমন কেন হয় যে, জামালুদ্দিন জারাবোযো বা বিলাল ফিলিপ্সরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন, দ্বীন সম্মত উপায়ে, সমূহ খুঁটিনাটি সমেত যাপন করার পরও, তাদের হাতে এমন অফুরন্ত সময় থাকে যে, তারা যা বিভিন্ন সভায় মানুষের উদ্দেশ্যে বলে থাকেন বা যা লিখে থাকেন, সেসব খুৎবার রেকর্ডিং শুনে বা সেসব বই পড়েই শেষ করতে পারি না আমরা। সবার জীবনের প্রতিটি মিনিটই যদি ৬০ সেকেন্ডে গঠিত হয়, প্রতিটি ঘন্টা যদি ৬০ মিনিটের সমষ্টি, আর প্রতিটি দিনই যদি ২৪ ঘন্টা দিয়ে গঠিত হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী জামাল জারাবযো যদি জীবনের প্রতিটি দিন, দ্বীনের রাস্তায় ব্যয় করতে পারেন, তবে বাংলাদেশের জকিগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী খাদ্য বিভাগের ঘুষখোর কোন কেরানী বা ছাগলনাইয়ায় জন্মগ্রহণকারী টেলিফোনের ঘুষখোর কোন কর্মকর্তা কেন বলেন যে ‘এসব কথা শোনার’ ‘সময়’ তার নেই! এই লাইনে ভাবতে গিয়ে আমি বারবার একটা অবস্থানেই ফিরে গেছি – আমরা, অধিকাংশ মুসলিম নামধারীরা, মূলত উপর্যুক্ত আয়াতের বক্তব্যে বিশ্বাসই করি না – অর্থাৎ আমরা বিশ্বাস করি না যে, ‘আমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল আল্লাহর ইবাদত করার জন্য’ – তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী চলার জন্য – তাঁকে উপাসনা করার জন্য।

আমাদের জীবনের যে ‘মূষিক-দৌড়’ – যার পরিণতি বা পরিণাম নিয়ে ভাবারও আমাদের ‘সময় নেই’ – একবার আপনি যদি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে নিজেকে তার বাইরে নিয়ে গিয়ে ঐ ‘মূষিক-দৌড়’ পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন যে, হাস্যকর অনেক লক্ষ্যের জন্য আমাদের তৈরী করা হয়েছে বা ‘সৃষ্টি করা হয়েছে’ – এমনটা মনে-প্রাণে ধারণ করে আমরা প্রাণান্তকর মূষিক-দৌড়ে ব্যস্ত । অথচ, সৃষ্টিকর্তা যে বলছেন, কেবল ‘একটি’ উদ্দেশ্যেই আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে – তার কোন আলামত তো ৯৯% মুসলিমের জীবনে নেইই – এমনকি তারা জানেন কি না বা কখনো শুনেছেন কিনা যে, ঐ ধরনের একটি চূড়ান্ত সংজ্ঞা-জ্ঞাপনকারী আয়াত কুর’আনুল করীমে রয়েছে – আমার সে নিয়েও সন্দেহ আছে!

তবলীগ জামাতের এক কর্মী – আমার এক ছোট ভাই, বছর দুয়েক আগে আমাকে বলছিলেন যে, তারা দেশের একটি গ্রামাঞ্চলে জামাত নিয়ে গিয়ে বুঝতে পারেন যে অনেকে হয়তো ‘কলেমা’ও জানেন না। এমত অবস্থায় কোন তরুণকে আমাদের নবীর নাম জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয় : “শেখ মুজিব”। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য – কোন সস্তা চুটকির বিষয়বস্তু হলে কি স্বস্তির নিঃশ্বাসই না ফেলা যেত! কিন্তু মাননীয় পাঠক, আমি বিশ্বাস করি যে, আমার ঐ ছোট ভাইয়ের মুখ থেকে সত্যি কথাই শুনেছি আমি। আমি তবলীগ জামাতের কর্মী নই, সমর্থকও নই। কিন্তু আমার ঐ ছোট ভাইকে একজন মানুষ হিসেবে আমি যতটুকু জানি – তাতে তথ্যটা নির্ভরযোগ্য। তাহলে বুঝুন ৮৭% মুসলমানের দেশ বলে আমাদের দেশের পরিচয়টা আসলে কেবলি একটা demographic তথ্য – এতে কিছ্ই আসে যায় না – এমনকি এধরনের মুসলমানের সংখ্যা যদি গোটা পৃথিবীর ৮৭%ও হতো তবু এটা নিশ্চিত যে, কুফফার তা নিয়ে বিচলিত হতো না। আমাদের মুসলমানিত্বের আসল গোপন রহস্য – অর্থাৎ, আমাদের মুসলমানিত্বের অন্তঃসারশূন্যতার কথা তারা জানে না। তাহলে তারা আমাদের আলোকপ্রাপ্তি নিয়ে মোটেই বিচলিত হতো না – আমাদের মেয়েদের কষ্ট তথা অর্থনৈতিক কাঠিন্য লাঘব করতে “জন্ম-নিয়ন্ত্রণ” তাদের প্রধান এজেন্ডা হতো না। তারা নিশ্চিন্ত থাকতো এই ভেবে যে, এদের সংখ্যা যতই বাড়ুক না কেন, তা থেকে কুফফারের আশঙ্কার কিছুই নেই। আর (যুক্তরাষ্ট্রের এক কালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী) Patrick Buchanan লিখতেন না: “For a millennium, the struggle for mankind’s destiny was between Christianity and Islam; in the 21st century, it may be so again…We may find in the coming century that …cultural conservative T.S.Eliot was right, when the old Christian gentleman wrote in ‘The Hollow Man,’ that the West would end, ‘Not with a bang but a whimper’- perhaps the whimper of a Moslem child in its cradle.”
[ দেখুন: “Global Resurgence of Islam”, The Washington Times, 21 August 1989. ]

গ্রামের ঐ তরুণ, নবীর নাম না জানলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইতিমধ্যে পৌঁছে যাওয়া A to Z চ্যানেলের পূর্ণ দৈর্ঘ্য ছায়াছবির ও নাটকসমূহের বদৌলতে, এরই মধ্যে দেশী ও দেশী ছবিতে অভিনয় করা ভারতীয় রূপ-ব্যবসায়ী নায়িকা ও সহ-নায়িকাদের মাপজোক সম্পর্কে যে সম্যক জ্ঞানলাভ করেছেন, তা একরকম নিশ্চিতই বলা যায়। দেশের যে অংশে আমার বাড়ী, সেখানে কতিপয় চায়ের দোকানে রঙিন টেলিভিশন লাগিয়ে টিকিট দিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি তথা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখানো হয়।

আপনি যদি সত্যিই জন-জীবন থেকে ক্ষণিকের জন্য নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে Rat-race বা ‘মূষিক-দৌড়’ পর্যবেক্ষণ করতে পারতেন, তাহলে বেশ মজার কিছু ব্যাপার দেখতে পারতেন। আপনাকে আমি একটু সাহায্য করছি। প্রায়ই দেখা যায় সাবধানী যাত্রীদের একটা অভিযোগ হচ্ছে এমন যে, আন্তঃজেলা বাসগুলোর ড্রাইভাররা বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালায় – প্রায়ই শুধু শুধু ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং-এ আত্মনিয়োগ করে। আপনি যদি দেখেন যে, এই তাড়াহুড়ার বা প্রাণান্তকর প্রতিযোগিতার পরে তার অর্জন কি বা কতটুকু, তাহলে অবাক হয়ে ভাবতে বসবেন যে, is it worth it?? প্রায়ই দেখবেন যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে আগে পৌঁছে চালক হয়তো আয়েশ করে পায়ের উপর পা তুলে একটা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে এক কাপ চা খাচ্ছে। একই কথা রিক্সাচালকদের বেলায়ও প্রযোজ্য।

এবার অধিকতর শিক্ষিত ও ‘সুসভ্য’ নাগরিকদের উদাহরণ দেয়া যাক। একটা কাল্পনিক পরিবারের কথা ধরি। ধরুন স্বামী ও স্ত্রী দু’জনেই কাজ করেন বাইরে। স্বামী কোন বহুজাগতিক কোম্পানির নির্বাহী। কল্পনার সুবিধার জন্য বর্ণনা দিচ্ছি খানিক, ধবধবে শাদা সার্টের উপরে টাই পরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অফিস করেন – উচ্চ শিক্ষিত এবং উচ্চ বেতনভুক্ত। স্ত্রীও চাকুরী করেন কোন প্রাইভেট কোম্পানীতে – ভালো বেতনের চাকুরী। উপরে ওঠার সিঁড়ি যেন তাড়াতাড়ি ডিঙ্গাতে পারেন, সেজন্য বিয়ের ৪ বছর পার হয়ে গেলেও, এখনো সন্তান গ্রহণের কথা বিবেচনা করেননি তারা – অনেকটা বলা যায় এক্ষুণি সন্তান প্রতিপালনের ‘সময় নেই’ তাদের। ধরুন বাসায় কেবল তারা দু’জনেই থাকেন। আর ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বাসায় ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে, দু’জনের কাছেই ঘরে ঢোকার ভিন্ন দু’টো চাবি আছে। আপনি এখানে পর্যবেক্ষক হিসেবে ধরুন আড়াল থেকে দেখছেন যে, তাদের একজন হন্তদন্ত হয়ে বাড়ী ফিরছেন – চেহারাটা সিরিয়াস। তিনি ঘরের দরজা খুলে ড্রয়িং রুমে ঢুকে ঘর আলোকিত করতে লাইট জ্বালালেন। এবার বলুন তো তিনি প্রথমেই কোন কাজটি করবেন?

একটু আগে আপনাদের বলেছি যে, আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিক সভ্যতার ব্যাপ্তির ফলে আমাদের সময়ের বিশাল সাশ্রয় হবার কথা – আর সেই সময় দিয়ে আমাদের কি করার কথা? আমরা যদি বিশ্বাস করি যে, আমাদের জন্মই হয়েছে কেবল আল্লাহর ইবাদত করার জন্য, তাহলে তো সাশ্রয় থেকে পাওয়া বাড়তি সময়টুকুতে আল্লাহর ইবাদত করার কথা; আল্লাহ্ যে সব কাজে খুশী হবেন, সেসবে সেই সময় ব্যয় করার কথা। উপরের প্যারাগ্রাফের নাগরিক স্বামী বা স্ত্রী ঘরে ঢুকে প্রথমেই কি কাজটি করবেন আমি আপনাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম – আমিই বলে দিচ্ছি। প্রায় নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে, তারা প্রথমেই তাদের TVটি চালু করবেন – নাগারিক জীবনে যাদের স্যাটেলাইট সংযোগ রয়েছে (আমার মত দু’একজন সেকেলে মানুষ ছাড়া যা আজকাল প্রায় সবারই রয়েছে) তাদের বেলায় আমার ‘TV চালু করার তত্ত্ব’ আরো নিশ্চিত ভাবে সত্যতা লাভ করবে ইনশাল্লাহ্ ! শুধু তাই নয়, এই TV যতক্ষণ তারা জেগে থাকবেন, ততক্ষণই যে চলতে থাকবে, তাও একপ্রকার নিশ্চিত। তাহলে ব্যাপারটাকে সহজে বলতে চাইলে কি এভাবে বলা যায় না যে, আমরা জীবনে যে সময়ের সাশ্রয় করছি তার একটা কারণ হচ্ছে আমরা যেন TV দেখতে পারি ঐ বেঁচে যাওয়া সময়ে, অথবা, আমরা যেন আয়েশ করে সিগারেট ফুঁকতে পারি। এভাবে আপনি অনুসন্ধান করলে দেখবেন যে, মানুষ একজোড়া মোজা কিনতে তিন ঘন্টা নিউ মার্কেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে – কেউবা জায়ের মামাতো বোনের মেয়ের বিয়েতে তাকে যেন দেখতে ভালো দেখায়, সেজন্য ৬ ঘন্টা কোন বিউটি পার্লারে কাটাচ্ছে। অথচ আত্মীয়, বন্ধু বা সুহৃদের সাথে কথা বলার সময় নেই তাদের – দ্বীনের কথা শোনার বা ভাবার কথা বাদই দিলাম।

আমি যে মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তাম সেটা ইসলামপন্থীদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মসজিদ। আমার বাসা থেকে মাইল দু’এক দূরে হলেও আমি সেখানে যেতাম মূলত দু’টো কারণে: ওখানকার খতীবরা সব দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত বিধায় তাদের খুৎবা সারবান হয়। আর দ্বিতীয়ত, অনেক বিদ’আত থেকে মুক্ত থাকা যায় ওখানকার পরিবেশে। এক জুম্মায় হঠাৎ খেয়াল করলাম যে, মসজিদে মাত্র দেড় সারি মানুষের সমাগম হয়েছে – যে সময় গিয়ে আমাকে সাধারণত ৭ম সারিতে বা তারো পিছনে স্থান করে নিতে হতো। আমার প্রথম চিন্তা ছিল কোথাও কোন অঘটন ঘটেনি তো? পরে বুঝলাম আসলে বহুদিন বন্ধ থাকার পর পাকিস্তান ও ভারতের ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছে পাকিস্তানে – ইয়াওমাল জুম্মায় ঐ ম্যাচ পড়াতে, তা মুসল্লিদের কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে বুঝিবা – তাই তারা কষ্ট করে এই মসজিদে না এসে হয়তো কাছের কোন মসজিদে নামাজ সেরে নিয়েছেন – যাতে ইরফান পাঠানের ব্যাটিং দেখা থেকে যথাসম্ভব কম বঞ্চিত হন তারা।

ইরফান পাঠানের কথা ইচ্ছা করেই বল্লাম এজন্যে যে, হিন্দুস্থানের পক্ষে অংশ গ্রহণ করা এই মুসলিমকে নিয়ে গর্বভরে নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশের একটি ইসলামপন্থী পত্রিকা। সেখানে বলা হয়ের্ছিল যে ইরফান পাঠানের ক্রিকেট খেলার প্রেরণার উৎস হচ্ছেন আল্লাহ্ (as if ক্রিকেট খেলা প্রায় যুদ্ধ-জয়ের মতই একটা গৌরবময় কর্মকাণ্ড)। তার পরেই আসছিল ইরফান পাঠানের ব্যক্তিগত জীবনের কথা। তার স্বপ্নকন্যা নাকি হিন্দুস্থানী ফিল্মী নায়িকা জুহী চাওলা – ইরফান পাঠান জুহী চাওলাকে জীবন সঙ্গিনী করতে না পারলেও, এমন কাউকে জীবন সঙ্গিনী করতে চান, যার মাঝে তিনি জুহী চাওলাকে খুঁজে পাবেন। মাননীয় পাঠক! এব্যাপারটি নিয়ে সুন্দর করে কথা বলার ভাষাও আমি হারিয়ে ফেলেছি। ক্রিকেট খেলার মত একটা খেলা – যা মানুষকে সারাদিন স্টেডিয়ামে বা TV সেটের সামনে আটকে রাখে – এমন কি জুম্মার নামাজে মসজিদে আসা থেকে পিছু টেনে ধরতে প্রয়াস পায় – সারা দেশের মানুষের সময়ের এই বিশাল অপচয়কে ও আসক্তিকে, ইসলামপন্থীরা যদি ইসলাম বিরুদ্ধ ব্যাপার বলে সনাক্ত না করে বরং প্রশংসনীয় মনে করেন এবং জুহী চাওলার ‘ক্রীতদাস’ ইরফান পাঠানের মুসলিম পরিচয়ে গর্ববোধ করে নিবন্ধ ছাপাতে পারেন, তবে ধিক্ তাদের ইসলামপন্থী পরিচয়ে আর ইকামতে দ্বীনের বুলিতে। তারাও হয়তো ঐ আয়াতের কথা শোনেননি যেখানে বলা হয়েছে যে, ‘মানুষ এবং জ্বীনকে সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল আল্লাহর ইবাদত করার জন্য’। অথবা, শুনলেও হয়তো ‘ইসলামপন্থী’ থেকে হালে ‘তিজারাহ্পন্থী’ হতে গিয়ে, তারা আজ তা ভুলতে বসেছেন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার মানুষেরা আমাদের পিতামহদের যুগের তুলনায় এক জীবনে যে বাড়তি প্রায় সাড়ে নয় বছর সময় লাভ করছেন (৫৭ বছরের গড় আয়ু ধরে নিয়ে এবং নানাবিধ যান্ত্রিক উন্নতিবলে প্রতিদিন ৪ ঘন্টা সময় বেঁচে যাচ্ছে বলে ধরে নিলে মোট সাশ্রয় হচ্ছে ৫৭x৩৬৫x৪ = ৮৩২২০ ঘন্টা = ৯.৫ বছর) তা মূলত ব্যয় হয়:
১) মূষিক দৌড়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনে
২) TV দেখতে
৩) অন্যান্য বিনোদনে

বা
৪) অশ্লীল ও শরীয়ত বিরূদ্ধ কাজে।

অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয়: ‘আমাদের জীবনের ধরন এবং জীবনযাত্রা থেকে এমনটা মনে হবার কথা যে আমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল অর্থ-উপার্জনের জন্য বা TV দেখার জন্য বা বিনোদনে গা ভাসানোর জন্য অথবা ভোগ-সুখে আত্মনিয়োগ করার জন্য।’

উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর মাঝে সময়ের অপচয়ের দিক থেকে বিচার করলে, TV পর্দার দিকে তাকিয়ে থেকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান যে সম্পদ ‘সময়,’ সেটার অপচয়টা বিশাল এবং নিষ্ফল। এখন আমাদের নাগরিক জীবনে তো বটেই – একটু উন্নত গ্রামীণ জীবনেও তা এক প্রকার ব্যাধির পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।

সময়কে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এই জন্য বললাম যে, আপনার জীবনে যেটুকু সময় আল্লাহ্ আপনাকে বেঁধে দিয়েছেন সেটুকুই আপনার জীবন। অন্যান্য সম্পদ জমা রাখা যায় বা সে সবের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কেবল সময় হচ্ছে এমন একটা সম্পদ যা আপনার জীবনের মতই ক্ষয়িষ্ণু – প্রতিমুহূর্তে কেবল কমেই যাচ্ছে – প্রয়োজনে আপনার সবচেয়ে আপন জনের কাছ থেকেও আপনি সময় ধার নিতে পারেন না, এবং একই ভাবে পারেন না তা ধার দিতে। সুতরাং, যে মুহূর্তটা চলে গেল, সেটাকে আর কাজে লাগানোর কোন উপায় নেই। অর্থ এখন কাজে না লাগিয়ে ছ’মাস পরে কাজে লাগানো যেতে পারে, কিন্তু সময়ের যে কোন একটি মুহূর্ত কেবল একদিকে প্রবহমান।

TV-র ব্যাধি আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয় TV প্রোগ্রামকে কেন্দ্র করে। যেমন ধরুন গৃহকর্তা বাইরে যাচ্ছেন সবাইকে নিয়ে – হয়তো বলছেন “তাড়াতাড়ি চলো, যাতে ‘XYZ’ প্রোগ্রামটি শুরু হবার আগেই ফিরে আসতে পারি।” কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু লন্ডন গিয়েছিলেন পেশাগত কাজে। তিনি বললেন যে, তিনি যে বাসায় ছিলেন, সে বাসায় তার অবস্থান কালে তাদের ‘পারিবারিক-বন্ধু’ এক পরিবার ঐ বাসায় বেড়াতে আসেন, যার মূল কারণ ছিল এরকম যে, একটা জনপ্রিয় সিরিয়ালের সময় প্রায় হয়ে এসেছিল এবং তারা তখন রাস্তায় ছিলেন – এমন জায়গায়, যেখান থেকে নিজেদের বাসায় যেতে যেতে সিরিয়ালের অনেকটুকু মিস্ করবেন তারা – তাই গাড়ি ঘুরিয়ে সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থিত এই ‘বন্ধু পরিবারের’ বাসায় চলে এলেন। এভাবেই TV প্রোগ্রামকে কেন্দ্র করে মানুষের জীবন আবর্তিত হয় এখন। অথচ মুসলিমের জীবন আবর্তিত হবার কথা নামাজের ওয়াক্ত/সময়কে কেন্দ্র করে – কারণ ‘তার জন্মই হয়েছে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য’। বেশীদিন আগের কথা নয়, আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম, তখনও মানুষ, বিশেষত গ্রাম অঞ্চলের মানুষ, মানুষের সাথে কার্যক্রম ঠিক করতে ‘আসরের পরে’ বা ‘বাদ-মাগরিব’ এমন কথা উচ্চারণ করতো – আজ হয়তো বলা হয় ‘অমুক নাটকের পরে’ বা ‘৮ টার খবরের পরে’।

TV-র ব্যাধি আরো যে অমূল্য সম্পদ আমাদের জীবন থেকে সন্তর্পণে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে, তা হচ্ছে ব্যক্তিগত ও পারস্পরিক সম্পর্কের উষ্ণতা। আধুনিকায়নের জন্য আমি সময়ের যে সাশ্রয়ের কথা উল্লেখ করেছি, সেটা শহুরে উন্নত জীবনে গ্রামীণ জীবনের চেয়ে বেশী হবার কথা। উদাহরণস্বরূপ শহরের একটা মধ্যবিত্ত বাসায় বর্তমানে একটা ফ্রিজ থাকতেই পারে। ‘এখন কিনুন এবং পরে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ করুন’ – ভোগ-সুখের ও ভোগ্যপণ্যের জয়জয়কারের যুগের এই ধরনের শ্লোগানের বদৌলতে একটা ওয়াশিং মেশিন ও রাইস কুকারও থাকতে পারে। গ্যাসের চুলা যে থাকবে সেটা প্রায় নিশ্চিত। তাহলে দেখুন একজন গৃহকর্তাকে হয়তো রোজ আর বাজারে যেতে হচ্ছে না, কাউকে হয়তো নিজের কাপড় আর কাচতে হচ্ছে না, জ্বালানি কাঠের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে না, ভাত রাঁধতে হচ্ছে না – ইত্যাদি ইত্যাদি উপায়ে কোন পরিবারের স্বামী এবং স্ত্রী দু’জনেরই প্রচুর সময় সাশ্রয় হবার কথা। এক কালে এই ঢাকা শহরের কোন গৃহকর্তাকে যেখানে একই পরিমাণ অন্ন ও বস্ত্রের সংস্থানের জন্য (প্রয়োজনীয়টুকুর কথাই না হয় ধরা যাক) আরো বেশী সময় বাইরে থাকতে হতো, ফেরার পথে বাজার করতে হতো, সপ্তাহে একদিন রেশনের লাইনে দাঁড়াতে হতো – গৃহকর্ত্রীকে সারাদিন রান্নাঘরে কাটাতে হতো – বয়স্ক গরুর মাংস সারাদিন ধরে চুলায় চাপিয়ে সিদ্ধ করতে হতো (কারণ প্রেসার কুকার তখন আজকের মত সহজলভ্য ছিল না) – খুঁতখুঁতে স্বভাবের হলে নিজের/স্বামীর কাপড় নিজে কাচতে হতো – আজ বলতে গেলে ঐ একই সামাজিক অবস্থানের পরিবারের স্বামী-স্ত্রীকে এসবের কিছুই করতে হয় না। একদিন যে গৃহবধূটি ‘সংসারের ঝামেলায়’ এবং ‘সময়ের অভাবে’ ভালো করে স্বামীর কাছে বসে দু’টো মনের কথা বলতে পারেনি, আজকের দিনের তেমন একটি পরিবারের গৃহবধূর তো স্বামীর সোহাগে আকণ্ঠ ডুবে থাকার কথা! কিন্তু তাই কি হয়!! না প্রায়শই তা হয় না, কারণ দুজনেই হয়তো ঐ বেঁচে যাওয়া বাড়তি সময়ে TV দেখেন – TV যেন দুজনেরই ক্লীব প্রেমাস্পদ অথবা মধ্যবর্তী একটা সত্তা।

আমাদের মুরুব্বী এক মহিলা যার বড় ছেলের বয়স ৫০-এর বেশী – যিনি একটা এপার্টমেন্টে তার বৃদ্ধ স্বামীসহ একাকী বসবাস করতেন, তিনি একদিন আমাকে সিরিয়াসলি অভিযোগ করলেন যে, (স্যাটেলাইট ডিশের কল্যাণে ২৪ ঘণ্টাব্যাপী রঙিন স্বপ্নের রাজ্য, কেবল রিমোটের বোতাম চাপার অপোয় থাকে বলে এবং এখন যেহেতু TV স্টেশন চালু হবার বা বন্ধ হবার আর কোন ব্যাপার নেই) তার বৃদ্ধ জীবন সঙ্গীটি সারাদিন TV-র পর্দায় glued হয়ে থাকেন বা আঠার মত লেগে থাকেন। আমি বুঝলাম যে, ঐ বৃদ্ধা মহিলার বয়স অন্তত ৭০ বছর হওয়াতে এবং নানা প্রকার অসুস্থতা হেতু, তিনি তার জীবনের হেমন্ত পেরিয়ে তখন হাঁড় কাঁপানো শীতকালে পদার্পণ করেছেন – তার জীবনের মায়াকাননের পত্র-পল্লব শুকিয়ে ইতোমধ্যেই গেছে। তাই বুঝিবা তার চোখে তখন সব ধূসর বর্ণ বোধ হয়। এমনও হতে পারে যে তার স্বামী – যার বয়স তখন আনুমানিক ৭৫ তো হবেই – তিনি হয়তো তার জীবনের হেমন্তকাল তখনো পেরিয়ে আসেন নি – তার মায়াকাননে তখনো হয়তো হলুদ বর্ণ পত্র-পল্লব অবশিষ্ট রয়েছে। মালাইকা অরোরা বা প্রীতি জিনতার নিতম্বের ঝাঁকুনি – তখনো হয়তো তার চিত্তে পুলক সৃষ্টি করে। আমি মহিলাকে যা বললাম তা অনেকটা, বহু বছর আগে পড়া, শিবরাম চক্রবর্তীর একটা ব্যঙ্গোক্তির সারমর্ম :
“পারলে তো আগেই পারতে, এখন কি আর পারবার জো আছে, এখনতো অপার পারাবার।”

মহিলা নিজেও যে এক সময় এই নিরবচ্ছিন্ন TV দর্শনে আত্মনিয়োগ করেছেন, তা প্রায় নিশ্চিতই বলা যায়। যখন “বয়স” ছিল – তখন হয়তো তা বন্ধ করে একে অপরকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারতেন। কিন্তু তখন আসলে তারা ‘living together alone’-এর মত বসবাস করেছেন। এখন ভদ্রলোক স্ত্রীর জন্য নিজের ভালো লাগাটুকু বিসর্জন দেবেন কেন? ব্যাপারটা একাধারে করুণ ও নিষ্ঠুর এক বাস্তবতা।

আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন বেশ অল্প বয়সেই স্কুলে না গেলে আমাকে বাজারে যেতে হতো – এছাড়া বড় ছেলে হবার বদৌলতে, অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে মুদির দোকানে তেল নুন আনতে যাওয়া ইত্যাদি সবই করতে হতো। তবু যেন আমাদের কত ‘সময়’ ছিল। বাসার ভৃত্য থেকে শুরু করে গ্রাম থেকে আসা আত্মীয়-স্বজন (যতদূর মনে পড়ে অতিথি/মেহমান ছাড়া তখন খুব কম দিনই অতিবাহিত করতাম আমরা। একটা কারণ ছিল আমার গ্রাম্য আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে খুব কমেরই তখন ঢাকায় ‘উঠবার’ জায়গা ছিল। সুতরাং ডাক্তার দেখাতে আসা থেকে শুরু করে ‘লন্ডনী’ হতে বৃটেনে গমনেচ্ছু আত্মীয়-স্বজন – সবাই আমাদের বাসায় এসে ‘উঠতেন’ তখন), কারো সাথেই আলাপ করার বা কারো খোঁজ-খবর নেওয়ার সময়ের অভাব ছিল না আমাদের। আজ আপনি যদি আপনার কোন আলোকপ্রাপ্ত বন্ধু-বান্ধবের বাসায় বেড়াতে যান, তাহলে একঘণ্টা বসে থেকেও হয়তো বুঝতে পারবেন না যে, আপনার বন্ধুর যে ছেলেটি PhD-র গুরুত্ব সহকারে স্কুলের পড়াশোনা করতে করতে আধ ইঞ্চি পুরু চশমার কাঁচ পরিধান করতে বাধ্য হয়েছে, সে আদৌ বাসায় আছে কিনা। আপনার ভাগ্য প্রসন্ন হলে এক ঘণ্টা পরে হয়তো দেখা যাবে একঝলকের মত সে একবার সামনে এসে, রোবটের মত ‘স্লামালাইকুম’ বলে একবার হাত তুলে, বিমানবালার মত ১০০% মেকী একটা শুকনো হাসি আপনাকে উপহার দিয়ে, আবার তার PhD-টেবিলে গিয়ে বসলো তার নিজস্ব ঘরে – অথবা হয়তো পড়াশোনার চাপ নির্গত করতে ভিডিও গেম নিয়ে বসলো। তার মা হয়তো আপনাকে কৈফিয়ত দিলেন : “জানেন গত সপ্তাহের কাস টেস্টে সে ১০-এর ভিতর ৯.৮৫ পেয়ে খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল – সেজন্য আমি এবার বলেছি একটু সিরিয়াসলি পড়া দেখে যেতে।”

মাননীয় পাঠক, এখানেও কথা এসে যাচ্ছে ‘সময়ের’। রেশন, বাজার, হেঁটে স্কুলে যাওয়া, মুদির দোকানে যাওয়া, ঘুড়ি ওড়ানো, সাইকেল/রিক্সার পুরানো চাকার রীম চটা দিয়ে বাড়ি দিতে দিতে রাস্তায় চালিয়ে নিয়ে যাওয়া, লাট্টু ঘুরানো, ঘুড়ির সুতার মাঞ্জা দেয়া, ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা করা (যাতে মা ঘরের কোন কাজ নির্বিঘ্নে সারতে পারেন), গ্রামীণ আত্মীয়-স্বজনকে attend করা, শিলাবৃষ্টি হলে শিল কুড়ানো, সাপের খেলা বা বানর নাচ ইত্যাদি পাড়ায় আসলে তাদের পিছনে পিছনে সম্ভাব্য প্রদর্শনীর স্থানে যাওয়া – এসবের পিছনে আমাদের যে সময় ব্যয় হতো এবং এখনকার পায়রার খোপের মত প্রকোষ্ঠে বসবাসরত ছেলেদের যে সময় সাশ্রয় হয় – আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে: বেঁচে যাওয়া ঐ সময় দিয়ে তারা কি করে? ভিডিও গেম খেলা, সিনেমা/টিভি দেখা অথবা ব্যান্ড-সঙ্গীতের সমাবেশে যাওয়া এ ধরনের একটি বা সবকয়টি মহৎ কাজে নিশ্চয়ই ব্যয় হয় সে সময়!

আজকালকার নাগরিক জীবনের ‘সুখী-পরিবারসমূহের’ বাসগৃহে বেড়াতে যেতেও আমার অস্বস্তি লাগে – অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল যারা, যাদের আর আমার ভিতর কোন অদৃশ্য দেয়াল রয়েছে বলে কখনো মনে হয়নি, তাদের বাসগৃহে যেতেও অস্বস্তি হয়। আমার ‘আলোকপ্রাপ্তি’ পর্যাপ্ত না হওয়াতে, টেলিফোন করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বা অনুমতি নিয়ে যাবার ব্যাপারটা এখনো ধাতস্থ হয়নি। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই এমন একটা সময় আসবে যখন টেলিফোনে অনুমতি না নিয়ে কোথাও যাবার প্রশ্নই আসবে না। এমনিতে কারো বাসায় ঢোকার আগে, অনুমতি নেয়া ১০০% ইসলামী – অনুমতি না নিয়ে অন্যের বাসগৃহে প্রবেশ করা ইসলাম-বিরুদ্ধ – কিন্তু এখনকার ব্যাপারটা প্রাইভেসির জন্যে অনুমতি নয়। এটা হচ্ছে হাই কালচারের ব্যাপার। এই হাই কালচার ইসলামী সঙ্ঘবদ্ধতার সম্পূর্ণ বিপরীতে, ‘যার যার তার তার’ অর্থাৎ individualism-এর উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কুফফার সৃষ্ট কালচার বা আচার। ইসলাম যেখানে আপনার গৃহকে প্রশস্ত করতে বলে, অর্থাৎ মেহমান মুসাফিরকে স্বাগত জানাতে বলে – বিশেষত দ্বীনের আলাপ-আলোচনা ও শিক্ষার জন্য, এখানে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। এখানে সাধারণভাবে মেহমান/মুসাফিরকে উটকো ঝামেলা মনে করা হয়। আজকালকার “দুর্গ সদৃশ” এ্যাপার্টমেন্টগুলোর কঠিন লোহার গারদ পেরিয়ে, ফকির থেকে শুরু করে অনেক গরীব আত্মীয়-স্বজন, তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না – অনেকে প্রহরীর বিব্রতকর জেরায় উত্তীর্ণ হয়ে কখনো ভিতরে যেতে পারলেও, পরের বার আসার সাধ তার মিটে যায় – কখনো হয়তো তওবাই করে ফেলেন; ভাবেন, “পথ ভুলে ভাই এসেছিলাম…।”

আজকালকার কনজ্যুমার কালচারের “মুষিক দৌড়ের” যুগে অত্যন্ত সুহৃদ কারো বাসায় গিয়ে আমাকেই অনেক সময় বিব্রত হতে হয়েছে। একটা ঘটনা স্পষ্ট মনে করতে পারি:
আমাদের বাসগৃহে স্যাটেলাইট সংযোগ না থাকাতে, আমার স্ত্রী এবং আমি দেশের ঐ সব ‘নালায়েক’ অপদার্থদের দলভুক্ত, যারা জানলই না যে হিন্দুস্থানের নির্ভেজাল কাফির-কালচার ভিত্তিক কোন অভূতপূর্ব সিরিয়ালটি (যেটি না দেখলে আমাদের ; মুসলিমদের জন্ম প্রায় অর্থহীন হয়ে যেতে পারে) সপ্তাহের কোন দিনে এবং কোন ক্ষণে! এভাবেই একদিন আমরা ঠিক ঐ ধরনের একটি বিশেষ মুহূর্তে এক বন্ধুর বাসার দুর্গের প্রহরীদের ছাঁকুনী পেরিয়ে তার কলিং বেলের বোতাম টিপি। দরজা খুলে আমাদের দেখে বন্ধুর পরিবারবর্গের চেহারা বিবর্ণপ্রায়। তাড়াতাড়ি TV বন্ধ করে তাদের ড্রয়িংরুমের ঘরোয়া পরিবেশকে আমাদের উপযোগী করে তোলা হলো। ঐ পরিবারের সবাইকে ইঙ্গিতে জানিয়ে দেয়া হলো যে, the party is over । ব্যাপারটা এতই অস্বস্তিকর ছিল যে, আমরা তাদের ঠিক কোন অপ্রতিরোধ্য সিরিয়ালটি দেখা থেকে বিরত করে তাদের মানব জনম প্রায় বিফল করে দিলাম – লজ্জায়-সংকোচে একথাটা তাদের আর জিজ্ঞেসই করতে পারলাম না। আমার অপরাধবোধের আরেকটা কারণ ছিল এই যে, আমি তাদের বলতেও পারছিলাম না যে, তারা যা দেখছিলেন তা দেখলেই পারেন – আমরাও তাদের সাথে দেখবো – দেখা শেষে না হয় আলাপ করা যাবে।

এভাবেই তাহলে আজ তিন দশকের বন্ধুত্বকে ‘সময়’ দেয়া থেকে, কাফিরের রূপ-ব্যবসার গ্রাহক বা consumer হওয়াটা আমাদের মুসলিমদের কাছে অধিকতর প্রিয়। এই বাস্তবতাকে আহমাদ থমসন তার বইতে: “There is less time to meet together and more time to watch television.” বলে বর্ণনা করেছেন [দেখুন:page#12, Dajjal – the AntiChrist – Ahmad Thomson.] । যাহোক্, আমরা যে দ্রুত অন্ধকার মৃত্যুর দিকে অনিবার্যভাবে ধেয়ে চলেছি – নিজের অস্তিত্বের চেয়ে অধিকতর নির্ভরযোগ্য এই সত্য অনুধাবন করার পর, আমার পরিবারের সদস্যরা, আমরা, বর্তমান বিশ্বে যাদের “আলোকপ্রাপ্ত” বলা হয় – ভোগ-সুখের রঙিন আলোতে ডুবে থেকে যারা মৃত্যুর অন্ধকার ভুলে থাকতে চান – সে সব মানুষের সাথে সামাজিক পর্যায়ের উঠাবসা বা সখ্যতা প্রায় এড়িয়েই চলি। এর ব্যতিক্রম হচ্ছেন তারা, যে সব আত্মীয়-বন্ধুদের আমরা খুব কাছের মনে করি এবং যাদের জাহান্নামের সর্বগ্রাসী আগুনে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করাটা সত্যিকার অর্থে তাদের প্রতি আমাদের স্নেহ-ভালোবাসার সবচেয়ে বড় দাবী বলে আমরা মনে করি – তাদের কাছে আমরা বার বার যাই – যাতে তাদের দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার একটা রাস্তা খোলা থাকে বা সুযোগ থাকে – যদিও TV নাটক, সিরিয়াল বা সিনেমার ঘোরে অচেতন অধিকাংশ মানুষের জীবনে এসব নিয়ে কথা বলার অবকাশ প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক ক্ষেত্রেই ভাবটা এমন যে, ‘কি করবো বলুন জীবনে সময় এত কম – জীবন এত ব্যস্ত যে, এসব নিয়ে ভাবারই সুযোগ হয় না’ – আবার কারো কারো ভাব এমন যে, “এখুনি কি? এসব নিয়ে ভাবার অনেক ‘সময়’ পড়ে রয়েছে, বয়সটা আরো বাড়ুক – তখন দেখা যাবেখন।”

সিঙ্গাপুরীদের ভিতর একটা চুটকি প্রচলিত আছে, যেটা ভিন্ন আঙ্গিকে আমি অন্য দেশের লোকজনদেরও বলতে শুনেছি। গল্পটা এমন:সেখানকার মাছের বাজারে জীবন্ত কাঁকড়া বিক্রি হয় – যেগুলোকে পাত্রে রাখা হয়। ঐ সব পাত্রের মুখ ঢেকে রাখতে হয়, যাতে কাঁকড়াগুলো পাত্র থেকে বেরিয়ে চলে না যায়। সিঙ্গাপুরের বাজারে, আমদানীকৃত কাঁকড়ার পাশাপাশি স্থানীয় কাঁকড়াও পাওয়া যায়। এক বিক্রেতা এমন তিনটি পাত্রে, তিনটি ভিন্ন উৎসের কাঁকড়া নিয়ে বসেছিল। দু’টো পাত্রের মুখ ঢাকা ছিল কিন্তু তৃতীয়টির উপর কোন ঢাকনা ছিল না। কোন ক্রেতা জিজ্ঞেস করলে, বিক্রেতা ব্যাখ্যা করেন যে, আমদানীকৃত কাঁকড়াগুলো ঢেকে রাখতে হয়, না হলে ওগুলো পাত্র থেকে বেরিয়ে চলে যায়। তবে সিঙ্গাপুরী কাঁকড়ার সমষ্টি নিয়ে সে ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় না। ক্রেতা তখন আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে, বিক্রেতা ব্যাখ্যা করেন যে, সিঙ্গাপুরী কোন একটা কাঁকড়া যদি পাত্র থেকে বেরুতে চায়, তবে বাকী যেগুলো বেরুতে অক্ষম, সেগুলো সেটাকে টেনে নীচে নামিয়ে নিয়ে আসে। সুতরাং কারো আর পাত্র থেকে বেরিয়ে আসা হয় না।

আমাদের দেশে এমন বহু পরিবার আছে, যেখানে একজন ছেলে বা একজন মেয়ে, প্রচলিত ধারার একেবারে বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করে আল্লাহর অশেষ রহমতে হেদায়েত লাভের আপ্রাণ চেষ্টায় নিয়োজিত – অথচ, এদের পরিবারের বাকী সকলে যেন পণ করেছেন যে, তাকে তারা কিছুতেই Pit of hell বা নরককুণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে দেবেন না। আমি আমার স্ত্রীর কাছ থেকে, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়স্কা এমন বেশ কয়েকজন মুসলিমাহ্ সম্বন্ধে জানি, যারা নিজ পরিবার কর্তৃক নির্বাসিত ও নিগৃহীত – কারণ তারা বিশ্বাসী এবং তারা হয়তো কুর’আনের ঐ বক্তব্য, যেখানে বলা হয়েছে যে, ‘আমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল আল্লাহর ইবাদতের জন্য’ – সেটাতে বিশ্বাস করেন। ঠিক এমনিভাবে আমি তিনজন ভদ্রলোকের কথা জানি, যারা মধ্যবয়স্ক বা বলা যায় মধ্যবয়সও পেছনে ফেলে মৃত্যুপথযাত্রী – অথচ, তাদের পরিবার, বিশেষত তাদের স্ত্রীরা, কিছুতেই যেন তাদের Pit of hell থেকে বেরিয়ে আসতে দেবেন না বলে পণ করেছেন – এরা সবাই সম্মানজনক সামাজিক অবস্থায় ও অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। অথচ জীবনের স্রোতের উজানে, হয়তো বিশ বছর আগে ইসলামসম্মত উপায়ে স্ত্রী নির্বাচন না করার যে ভুল করেছিলেন, তারই খেসারত দিতে গিয়ে আজ নিজ গৃহে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। তিলে তিলে পৃথিবীতেই যে বেহেস্ত গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন, বৈষয়িক দিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ বেহেস্ততুল্য ঘর সাজাতে পারলেও, তা জাহান্নামতুল্য সংসারে পরিণত হয়েছে – অথচ সংস্কার বা অনিশ্চয়তার ভয়ে সেই সাজানো বাগানসদৃশ নরককে ভেঙ্গে তছনছ করে নতুন করে, house-এর পরিবর্তে সুন্দর home-এর স্বপ্ন দেখতে তারা ভয় পান। এজন্যই আল্লাহ্ বুঝিবা কুর’আনে বলেছেন যে, স্ত্রী-সন্তানের মাঝে আমাদের শত্রু নিহিত রয়েছে ।

এতক্ষণ ধরে আমরা উপরে যা আলোচনা করলাম, সেখান থেকে আমরা এই অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, আধুনিকায়নের ফলে, যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশের ফলে, নানা রকমের gadget-এর উদ্ভাবনের ফলে আমরা আজ প্রচুর ‘সময়’ বাঁচাতে সক্ষম। গড় আয়ু ৫৭ বছর ধরলে, জীবনে আমরা হিসেব করেছি গড়ে ৯.৫ (সাড়ে নয়) বছর বা, গোটা জীবনের ১/৬-এর সমতুল্য অতিরিক্ত ‘অবসর সময়’ বেরিয়ে আসছে, যা ৫৭ বছরের আয়ুষ্কালের ১৬.৬৭%। আমরা যদি বিশ্বাস করতাম যে, ‘আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে কেবল আল্লাহর ইবাদত করার জন্য’, তাহলে, সময়ের এই বিশাল সাশ্রয়কে আমরা আল্লাহর পছন্দনীয় কাজে ব্যয় করতাম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, আমরা সাশ্রয়কৃত ঐ সময়কে সিগারেট ফুঁকা, ক্রিকেট খেলা দেখা, ভিডিও গেম খেলা, ইন্টারনেটে পর্ণোগ্রাফিক সামগ্রী উপভোগ করা, বা সিনেমা-নাটক দেখা ইত্যাদির মত ‘মহৎ’ কাজে ব্যয় করে এমন ব্যস্ততার ভান করছি যে, সময়ের অভাবে আমরা দ্বীনের দু’টো কথা শোনা বা কি করে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, এসব চিন্তা ভাবনা করা তো দূরে থাক, অনেকে হয়তো ব্যস্ততার জন্য ন্যূনতম ফরজ নামাজটুকুও পড়তে পারছি না। আমাদের জীবনের এই ধরন এবং জীবনযাত্রা দেখে, তাহলে কি একথা বলতে হয় যে আমাদের, অর্থাৎ কুফরে ডুবে থাকা মুসলিম নামধারীদের জন্মই হয়েছে কেবল অর্থ-উপার্জনের জন্য, TV দেখার জন্য, বিনোদনে গা ভাসিয়ে দেয়ার জন্য এবং ভোগ-সুখে আত্মনিয়োগ করার জন্য?

****

রাসূল (সা.) অবসর সময় ও নীরোগ স্বাস্থ্য বা সু-স্বাস্থ্য – এ দুটো নিয়ামতকে যথাযথ উপায়ে ব্যবহারের তাগিদ দিয়ে গেছেন। এছাড়া আর একটি হাদীসে তিনি ৫টি নিয়ামতের কথা উল্লেখ করে, সেগুলো হারিয়ে যাবার আগেই সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে বলেছেন। আমরা একটু খেয়াল করলে বুঝবো যে, সেগুলো ঘুরে ফিরে আবার ‘সময়ের’ সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে সম্পৃক্ত – বস্তুত ‘হারিয়ে যাওয়া’ কথাটার ভিতরেই সময়ের variable বা function হবার একটা sense রয়েছে। আসুন আমরা ঐ পাঁচটি নিয়ামতকে একটু পরীক্ষা করে দেখি।

রাসূল (সা.) জীবনে ৫টি নিয়ামতের পূর্ণ বা সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে বলেছেন, সেগুলো ৫টি পরিণতিতে পৌঁছাবার আগেই :
ক) জীবনকে কাজে লাগতে বলেছেন মৃত্যু আসার আগেই।
খ) সু-স্বাস্থ্যকে কাজে লাগাতে বলেছেন অসুস্থ হবার আগেই।
গ) অবসর সময়কে কাজে লাগাতে বলেছেন ব্যস্ততা আসার আগে।
ঘ) যৌবনকে কাজে লাগাতে বলেছেন বার্ধক্য আসার আগে।
ঙ) সম্পদকে কাজে লাগাতে বলেছেন দারিদ্র্য আসার আগেই।

গণিতে Parametric Equation বলে একটা কথা আছে। ধরুন ‘x’ একটা রাশি যা ‘t’-এর সাথে একটি সমীকরণ দ্বারা সম্পর্কযুক্ত (আমরা বলতে পারি t হচ্ছে x-এর variable) । তেমনি ধরুন ‘y’ হচ্ছে আরেকটি রাশি যা আবার আরেকটি সমীকরণ দ্বারা ‘t’-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত (আমরা বলতে পারি t হচ্ছে y-এরও variable)। এই দু’টো Parametric Equation থেকে আমরা বলতে পারবো বা প্রমাণ করতে পারবো যে, x-এর সাথে y-এর একটা নির্দিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। ঠিক একই ভাবে উপরের ৫টি নিয়ামতের প্রত্যেকটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সময়ের variable । ঐ ৫টি উপদেশের সারমর্ম হচ্ছে: “জীবনের একটি মুহূর্তও নিষ্ফলভাবে হারিয়ে যেতে দিও না”– এই তো!

এখানে আরেকটা ব্যাপার ভাবার রয়েছে, যা আমার মাথায় আগে ঠিক এভাবে কখনো আসেনি। ধর্মান্তরিত মুসলিম ‘আলেম, ভাই সেলিম মর্গান, তাঁর এক খুৎবায় বললেন যে, আপনি যৌবনে পদার্পণ করার পর অর্থাৎ বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছার পরই আপনার আমলনামা লেখা শুরু হয়। তখন থেকে আপনার প্রতিটি কর্ম হয় আপনার পক্ষে যাবে অথবা আপনার বিপক্ষে যাবে – আপনি কি করলেন বা করলেন না, তা হয় আপনার পক্ষে যাবে বা বিপক্ষে যাবে – অথবা বলা যায় যে, অনিশ্চিত দৈর্ঘ্যের সীমিত জীবন আল্লাহ্ আপনাকে দিয়েছেন, তার প্রতিটি মুহূর্ত হয় আপনি এমনভাবে ব্যয় করছেন যে, তা আমলনামায় সৎকাজ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে, না হয় মন্দকাজ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে এখানে এই দুই অবস্থার মাঝখানে নিরপেক্ষ কোন অবস্থা নেই – কারণ, ভালো কাজে না লাগিয়ে এমনি এমনি সময় কাটিয়ে দিলেও আপনি আপনার জীবনের অপব্যয় করলেন – এবং তা আসলে অপব্যয় হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে। একজন মুসলিমের সুতরাং, Passage of Time-এ উৎফুল্ল হবার কোন কারণ নেই।

তর্কের খাতিরে আমি আবার বলছি যে, মনে করুন আপনার জীবনের আয়ুষ্কাল ৫৭ বছর যা আসলে ২,৯৯,৫৯,২০০ মিনিটের সমষ্টি। ধরুন, আপনার সারা জীবনের জীবিকার জন্য মিনিটে ১ টাকা হিসেবে আপনার হাতে ১০০ টাকার নোটে, মোট ২,৯৯,৫৯,২০০ টাকা একত্রে তুলে দেয়া হয়েছিল। আপনি একটা চুলার পাশে বসে, একের পর এক ১০০ টাকার নোট চুলায় পুড়িয়ে ফেললেন ২ দিনের ভিতরই। তারপর আপনার জীবনের নির্ধারিত টাকা শেষ হয়ে গেলে, জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বহনের জন্য আপনার হাতে আর কোন অর্থ রইলো না। বাকী জীবন আপনাকে ভিক্ষার উপর এবং অন্যের করুণার উপর বাঁচতে হবে – এমন নির্বুদ্ধিতার কাজ কি কোন উন্মাদ ব্যক্তির কাছেও আশা করা যায়? না, কারণ আজকালকার পাগলেরা – এমনকি শিশুরাও বুঝি “অর্থ” সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন। যা হোক, এখন দেখুন আখেরাতের সীমাহীন জীবনের provision বা ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করার জন্য, আপনার হাতে ২,৯৯,৫৯,২০০ মিনিট সময় তুলে দেয়া হয়েছিল – আপনি কি পৃথিবীর চুলার পাশে বসে সেসব পুড়িয়ে শেষ করতে পারেন? সামান্য বুদ্ধি থাকলে প্রথম বর্ণনার ব্যক্তি যেমন ঐ টাকা দিয়ে কিছু কিনতো, কোন সম্পদ, বা তা কোন ব্যবসায় খাটাতো বা অন্তত তার ৫৭ বছরের জীবনকে সামনে রেখে কি করে সে জীবন যাপন করবে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতো – ঠিক তেমনি আমাদের সবার হাতে আখেরাতের সীমাহীন জীবনের ব্যবস্থাপত্র করে নেয়ার জন্য যে নির্দিষ্ট পরিমাণ “সময়” তুলে দিয়েছেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’লা, সামান্য বুদ্ধি থাকলে আমরা চেষ্টা করবো তা দিয়ে provision কেনার। তা না করে, যেন তেন ভাবে সময় কাটিয়ে আমরা যদি কবরে যাই, তবে আমাদের একমাত্র ভরসা হবে করুণাবশত কেউ যদি(যেমন সন্তান-সন্ততি) আমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করে এবং সেজন্য আল্লাহ্ যদি আমাদের শাস্তির ভার লাঘব করেন। এমন সন্তান, যারা পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর কাছে করুণা ভিক্ষা করবে – তাদের নিশ্চয়ই সুসন্তান হতে হবে! বলা বাহুল্য যে, তেমন সুসন্তান পৃথিবীতে রেখে যাবেন যে পিতা, তিনি নিজেও ভালো মুসলিম হবেন, এটাই স্বাভাবিক (অন্যথা হচ্ছে ব্যতিক্রম) – সুতরাং, যিনি নিজের জীবন অপব্যয় করে যাবেন, তার সন্তানেরা যে তার জন্য দোয়া করতে গিয়ে TV-তে Bay watch বা জেনিফার লোপেজের চটকদার waiting for tonight-এর মত একটা গানের ভিডিও দেখার “অপরিহার্য মহৎ কাজ” থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, বাবার জন্য দোয়া করে তাদের ‘সময়’ ব্যয় করবে – তা আশা করা উচিত নয়। তবে হ্যাঁ, পিতা যদি তাদের ‘মানুষ’ করে যান – প্রচলিত অর্থে যার সারমর্ম হচ্ছে চুরি করে হোক বা অসৎ পথে উপার্জন করেই হোক, সন্তানদের বিত্ত বৈভবের অধিকারী হবার যোগ্য করে তোলা – তবে তারা হয়তো ‘শবে বরাতের’ রাতে দশ পদ হালুয়ার সাথে রুটি বিতরণ করে, অথবা, পিতার আত্মার শান্তি কামনায় একসাথে ১০ জন মোল্লা ডেকে, জন প্রতি ৩ সিপারা হিসেবে মাত্র দু’ঘণ্টায় ৩ x ১০ বা ৩০ সিপারা, অর্থাৎ গোটা কুর’আন ‘খতম’ করার ব্যবস্থা করবে – অবশ্য যদি ঐ রাতের সাথে once in a life time মার্কা কোন অনুষ্ঠান coincide না করে যায়। ‘শবে বরাতের’ সময় যেহেতু পরিবর্তন হতে থাকে – তা কখনো কোন অপরিহার্য বিশেষ অনুষ্ঠান, যেমন ধরুন ‘অস্কার পুরস্কার’ বিতরণ অনুষ্ঠানের সাথে মিলে গেলে, মৃত পিতার কপাল খারাপ বলতে হবে। একসাথে এত বিশাল সংখ্যক দেহ ও রূপ ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বকে একনজর দেখার এমন বিরল সুযোগ হাতছাড়া করে, কি করে ঐ সব আয়োজন করা যায় – তার চেয়ে না হয় পরের দিন ‘দোয়া-দরূদের’ ব্যবস্থা করলে হয় – শবে বরাতের পরের দিনটাও তো ‘ফজিলতপূর্ণ’ – ইসলামী নিয়মে তো সন্ধ্যা থেকে দিন শুরু হয়ে পরের সন্ধ্যা পর্যন্ত একই দিন থাকে নাকি!

আবারো একটা প্রাসঙ্গিক গল্প মনে হলো। যুক্তরাজ্যের পটভূমিতে ঘটা একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই গল্প। জনৈক ইয়েমেনী ভদ্রলোক – খুব সম্ভব রেঁস্তোরার ব্যবসায়ী। যখনই তাকে কোন দ্বীনী মজলিসে ডাকা হতো – তিনি বলতেন যে তার ‘সময়’ নেই – বৌ-বাচ্চার জন্য উপার্জন করাও তার জন্য সমধিক জরুরী বলে তিনি মত প্রকাশ করতেন। বলা আবশ্যক যে, জীবনে তিনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপার্জন করেন এবং সেই সুবাদে মৃত্যুর সময় পরিবারের জন্য অনেক সম্পদ রেখে যান। যে মজলিসে তিনি “সময়ের অভাবে” আসতে পারতেন না, সেই মজলিসের দ্বীনী ভাইরাই তার জানাযা ইত্যাদির ব্যবস্থা করেন। যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, লাশ সমাহিত করার জন্য, কিছু নিয়ম কানুন ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবার অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। সেসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত মরদেহ মর্গে বরফ-বাক্সে সংরক্ষিত থাকে। ঐ ভদ্রলোকের মরদেহ বরফ-বাক্সে রাখার পরে, ভদ্রলোকের স্ত্রী-পুত্র হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে উক্ত মজলিসের দ্বীনী ভাইদের জিজ্ঞেস করেন যে, ঐ ভদ্রলোকের হাতে অত্যন্ত দামী একটা আংটি ছিল সেটার কি হয়েছে? দ্বীনী ভাইয়েরা বললেন যে, স্বাভাবিকভাবে তারা আংটিখানা বের করতে পারেন নি বলে, তা রয়ে গেছে ওভাবেই – মৃতদেহকে আর ‘কষ্ট’ দিতে চাননি তারা। মৃত ভদ্রলোকের স্ত্রী-পুত্র অসন্তুষ্ট চিত্তে ছুটলেন ‘মিস্ত্রী’ আনতে – দ্বীনী ভাইদের অনুরোধ অগ্রাহ্য করে। মজলিসের ভাইরা তাদের অনুরোধ করছিলেন মৃতদেহের আঙ্গুল কেটে আংটি না বের করার জন্য, কারণ আল্লাহর রহমতে তিনি প্রচুর সহায় সম্পত্তি রেখে গিয়েছেন তাদের জন্য। কিন্তু তারা তা শুনলেন না – উত্তরাধিকারের দাবীতে ভদ্রলোকের নিস্প্রাণ দেহের আঙ্গুল কেটে সম্পদ আহরণ করলেন ভদ্রলোকের স্ত্রী ও পুত্র। হায়, এদের জন্য উপার্জন করতে গিয়েই তিনি কখনো দ্বীনের দু’টো কথা শোনার ‘সময়’ পাননি!

আমার গল্প এখানেই শেষ। মাননীয় পাঠক, আমি বলছি না যে আপনি আপনার পরিবারের ভরণ পোষণের দায়-দায়িত্ব পরিহার করে বৈরাগী হয়ে যাবেন! না মোটেই না। পরিবারের জন্য, পরিবারের প্রয়োজনীয় ভরণ-পোষণের জন্য আপনার ব্যয়, ধর্মযুদ্ধে ব্যয়কৃত অর্থের চেয়ে শ্রেয়। কিন্তু আপনাকে বুঝতে হবে যে, প্রয়োজনীয় মৌলিক দাবীগুলো পূরণের পর আপনি যখন সম্পদ-আহরণের-জন্য ‘সম্পদ আহরণে’ আত্মনিয়োগ করবেন, অথবা, আপনি স্ত্রী পুত্রের জন্য সম্পদের পাহাড় গড়তে গিয়ে আল্লাহ্ যে আপনাকে কেবল তাঁর ইবাদতের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, তা ভুলে রইলেন, তখন আপনি আপনার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হলেন।

আপনি যখন ঢাকা থেকে সিলেট যাবার জন্য ট্রেনে চাপেন, তখন যদি শুরুতে আপনাকে কেউ জিজ্ঞেস করে যে, আপনি ট্রেনে কেন উঠেছেন – আপনার সহজ উত্তর হবে যে আপনি সিলেট যাবার জন্য ট্রেনে উঠেছেন। এখন সিলেট যাবার পথে আপনার গাড়ি আখাউড়া (অল্প কিছুদিন আগেও ঢাকা থেকে ট্রেন আখাউড়া হয়ে সিলেট যেত) , শ্রীমঙ্গল ইত্যাদি নানা স্টেশনে থামলো। আপনি কোথাও প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হয়তো একটা ডাব খেয়েছেন – কোথাও বা বাড়িতে আপনার পথ চেয়ে বসে থাকা মায়ের জন্য ফল কিনলেন – এগুলো আনুষঙ্গিক ঘটনা। সিলেট যাবার মূল লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে পথে ঘটা আনুষঙ্গিক ঘটনা। আপনি কেন ট্রেনে ভ্রমণ করছেন এর উত্তরে আপনি নিশ্চয়ই কাউকে বলবেন না যে, আখাউড়া স্টেশনে একটা ডাব খাবার জন্য আপনি ট্রেনে উঠেছেন। পথে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা সত্ত্বেও আপনি আপনার মুখ্য উদ্দেশ্যের কথাই বলবেন। ঠিক তেমনি আপনাকে সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল আল্লাহর ইবাদত করা ‘উদ্দেশ্যে’। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পথ চলতে গিয়ে আপনার জীবনে অনেক আনুষঙ্গিক ব্যাপার স্বাভাবিকভাবেই আসবে। কিন্তু কখনো এসব আনুষঙ্গিক ব্যাপার যদি মুখ্য হয়ে যায়, তবে আপনি আপনার জীবনের উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছেন বলে বলতে হবে এবং তা আপনার জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক বলতে হবে – অনেকটা আখাউড়া স্টেশনে ডাব খেতে গিয়ে আপনি ভুলে গেলেন যে আপনি আসলে সিলেট যাবার জন্য ট্রেনে উঠেছিলেন এবং আপনার ট্রেনখানা আপনার অজান্তেই আখাউড়া ছেড়ে চলে গেল – এমন একটা ঘটনার মতই হাস্যকর এবং দুঃখজনক হবে আপনার জীবনের সেই ভ্রান্ত-দশা।

মুসলিম জীবন গাধার মত কেবল উপার্জনের পেছনে খাটাখাটুনি করবার জন্য সৃষ্ট নয়। বরং মুসলিম জীবনে সবকিছুর জন্য সঠিক পরিমাপের ‘সময়ের’ ব্যয়বরাদ্দ থাকবে। আমরা গল্প করবো, সামাজিকতায় সময় ব্যয় করবো, স্ত্রীকে সঙ্গ দেব – গল্প করার জন্য, ভ্রমণের জন্য বা স্রেফ মনোরঞ্জনের জন্য। কিন্তু এসব কিছুর ঝামেলায় কিছুতেই আমাদের জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্যটা হারিয়ে যাবে না।

ইসলামী পরিভাষার ভুল ব্যয়ের বা অপব্যয়ের দু’টো ধারণা রয়েছে – একটা হচ্ছে ভুল পথে ব্যয় করা – অপরটি হচ্ছে সঠিক পথে হলেও, অতিরিক্ত ব্যয় করা। উদাহরণ স্বরূপ, আপনি মদ কিনতে আপনার অর্থ ব্যয় করলেন – এখানে মদ কেনার উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় করাটাই নিষিদ্ধ বা হারাম, তার পরিমাণ যাই হোক না কেন – ঐ পথে সামান্যতম অর্থ বা সম্পদ ব্যয় করাটাই ‘হারাম’। এই ধারণাকে ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় ‘তাবজীর’। আরেকটি অপব্যয়ের ধারণাকে বলা হয় ‘ইস্রাফ’ – যেখানে কোন নির্দিষ্ট পথে ব্যয় করাটা মূলত ‘হারাম’ নয়। কিন্তু ঐ পথে অতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে বলে তা অপব্যয়। উদাহরণস্বরূপ, খাবার কিনতে অর্থ ব্যয় করাটা এমনিতে হারাম নয় – কিন্তু আপনি যেখানে ২/৩ পদ দিয়ে তৃপ্তি সহকারে আপনার আহার সম্পন্ন করতে পারেন, সেখানে আপনার সঙ্গতি আছে বলে ১০/১৫ পদের আয়োজন করলেন – কিছুটা খেলেন, বাকীটুকু ছড়িয়ে ছিটিয়ে নষ্ট করলেন। এখানে ব্যাপারটা over allocation-এর পর্যায়ে পড়লো – এটাও অপব্যয় এবং জুলুম।

পবিত্র কুর’আনে এই দুটো অপব্যয়ের concept-ই উল্লেখিত আছে। ‘তাবজীর’ সম্বন্ধে বলা হয়েছে ১৭ : ২৬-২৭ আয়াতে আর ‘ইস্রাফ’ সম্বন্ধে বলা হয়েছে ২০ : ১২৪-১২৭ আয়াতে। সময়কে ইসলামে মহা-মূল্যবান সম্পদ বলে গণ্য করা হয় বলে, অপব্যয়ের ব্যাপারে তিরস্কারসমূহ, সময়ের অপব্যয়ের ব্যাপারেও প্রযোজ্য। অন্য সম্পদের মতই সময়ের অপব্যয়ও এই দুই শ্রেণীভুক্ত হবে। যেমন ধরুন মালাইকা অরোরার নৃত্য বা পামেলা এন্ডারসনের দেহ সৌন্দর্য্যরে দৃশ্য TV-তে উপভোগ করতে গিয়ে আপনি সময় ব্যয় করলেন – এটা প্রথম শ্রেণীতে পড়বে অর্থাৎ ‘হারাম’ পথে সময় ব্যয় করা হলো বলে তা ‘তাবজীরের’ পর্যায়ে পড়বে। আবার ধরুন আপনি একটা দোকান সাজিয়ে ‘হালাল’ সামগ্রীর ব্যবসায় করেন। কিন্তু বিকিকিনি খুব ভালো হচ্ছে বলে আপনি আপনার সব সময় সেখানেই ব্যয় করলেন – দ্বীনের কাজ-কর্ম ভুলে রইলেন – এই পথে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করাটা ‘ইস্রাফ’ বলে গণ্য হবে, যদিও আদতে ব্যবসায়টা ‘হারাম’ ছিল না।

সুতরাং সময়ের ব্যাপারে আমাদের অত্যন্ত সাবধান হতে হবে – প্রথমত আমরা যেন ‘হারাম’ কাজে সময় ব্যয় না করি। আর দ্বিতীয়ত জীবন ধারণের জন্য – ‘কেবল আল্লাহর ইবাদতের জন্য’ সৃষ্ট আমাদের এই জীবন ধারণ ও সে জীবন যাপনের জন্য – স্বাভাবিকভাবেই কিছু আনুষঙ্গিক ব্যাপার বা incidental ব্যাপার থাকবে, যেগুলোর জন্য কিছু সময়ের বরাদ্দও অনুমোদিত। কিন্তু আখাউড়ার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ডাব খেতে গিয়ে ট্রেন মিস্ করার মত করে, সেসব আনুষঙ্গিক ব্যাপারকে মুখ্য মর্যাদা দিয়ে, সেদিকে সব ‘সময়’ ব্যয় করে যদি আমরা আমাদের কাছে প্রত্যাশিত ইবাদত-কার্য পালনে ব্যর্থ হই, তবে আমাদের অবস্থা হবে ২০ : ১২৪-২৭ বর্ণিত দুর্ভাগা ব্যক্তির মত।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, প্রতিটি মুহূর্ত কেটে যাবার সাথে সাথেই ঐ মুহূর্তে আমরা কি করলাম তা ‘রেকর্ড’ হয়ে রইলো – হয় তা আমাদের পক্ষে যাবে, নয় তা আমাদের বিপক্ষে যাবে। এই ‘রেকর্ড’ কিছুতেই মোছা যাবে না – এই ‘রেকর্ড’ reversible নয়। ‘ঘুষ’ দিয়ে বা দারোগা সাহেবের হাতে-পায়ে ধরে আসামীর তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ানোর কোন system নেই এক্ষেত্রে।

যারা চতুষ্পদ জন্তুর মত ভোগ-সুখের প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিতে নারাজ এবং যাদের চিন্তাশক্তি কাফির-মুশরিকদের দেহ তথা রূপ ব্যবসায় ভিত্তিক মায়াজালে আবদ্ধ নয়, তারা হয়তো ভাবনায় পড়তে পারেন যে, জীবনের সময়কে তাহলে কি করে সর্বোত্তম ও সর্বাপেক্ষা কাজে লাগানো যায়। এ ব্যাপারেও আল্লাহ্ স্পষ্ট দিক নির্দেশনা দিয়েছেন পবিত্র কুর’আনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে ছোট্ট সূরাসমূহের একটিতে ।

সূরা আল্ আসরের সর্বমোট তিনটি আয়াতের প্রথম আয়াতটি হচ্ছে, “আসরের শপথ” – অধিকাংশ তফসীরকার বা অনুবাদকের মতে একথার অর্থ হচ্ছে “সময়ের শপথ”। দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন, “নিশ্চিতই মানুষ ক্ষতির মাঝে রয়েছে।” তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন “কেবল তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, যারা সৎকাজ করে, যারা একে অপরকে সত্য সম্বন্ধে শিক্ষা দেয় এবং যারা একে অপরকে ধৈর্যের পরামর্শ দেয়।” – ব্যাস্ কি Precise এবং Concise দিক নির্দেশনা – এক পৃথিবী বক্তব্য মাত্র তিনটি বাক্যের ভিতর সন্নিবেশিত হয়েছে। ‘সময়ের শপথ’ দিয়ে শুরু করাটা এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের সকল চিন্তা-ভাবনা, অর্থ, সম্পদ, জ্ঞান, বিত্ত, বৈভব সবকিছুকে নিষ্ফল প্রতীয়মান করে বলা হয়েছে, ”মানুষ মাত্রই ক্ষতির ভিতর পতিত” – যদি সে এই চারটি শ্রেণীভুক্ত না হয়ে অন্য কিছু হয়। এই চারটি শ্রেণীভুক্ত হতে গিয়ে সে যেটুকু সময় ব্যয় করবে জীবনের, সেটুকুই তার লাভ — বাকী সকল প্রয়াস ও সময়ক্ষেপণ তাকে কেবল ক্ষতির দিকেই টেনে নিয়ে যাবে।

মুসলিম বিশ্বাস মতে প্রথম শ্রেণীভুক্ত না হতে পারলে জীবনের “ষোল আনাই মিছে” – ঈমান না আনলে গোটা জীবনের সমীকরণের দুপাশেই শূন্য লেখা থাকবে। দ্বিতীয় শ্রেণী হচ্ছে যারা সৎকাজ করে। বলা বাহুল্য প্রথম শ্রেণীতে দাখিল হবার পরেই কেবল, দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত হওয়াটা অর্থবহ হবে – ঈমানবিহীন কোন কাজই ইসলামের দৃষ্টিতে ‘সৎকাজ’ বলে পরিগণিত হতে পারে না – ঈমান সমেত ‘সৎকাজ’ও আবার হবে সেই কাজ, যেটাকে আল্লাহ্ বা আল্লাহর রাসূল(সা.) ‘সৎকাজ’ বলে চিহ্নিত করেছেন। আপনি মানবতাবাদী বলে যদি মনে করেন যে, প্রতিটি মানুষের নিজের জীবনের সুখ-দুঃখ সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রয়েছে – আর তাই সমকামী মেয়েরা যদি নিজেদের মাঝে সমকামী বিবাহের মাধ্যমে জীবনে সুখী হতে চায়, তবে তা সমর্থনযোগ্য – তবে আপনি আপনার এহেন ‘মানবিক’ গুণাগুণের জন্য ‘পুলিটজার’ পুরস্কার পেলেও, আপনার নিশ্চিত গন্তব্য জাহান্নাম হবার কথা এবং আপনার এই ‘মহৎ’ কাজ ইসলামের দৃষ্টিতে কখনোই ‘সৎকাজ’ বলে গণ্য হবে না। সুতরাং, আল্লাহ্ ও আল্লাহর রাসূল(সা.) যে সবকে ‘সৎকাজ’ বলেছেন, সে সব সৎকাজে নিয়োজিত হতে হবে। ‘চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়’ মার্কা কাফির-শিল্প উপভোগ করার মহৎ কাজে আত্মনিয়োগ করে নিজের আত্মীয়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা ‘সৎকাজ’ নয় বরং ঘরে কোন মেহমান আসলে তার বাস্তবতাকে, TV-র স্বপ্নরাজ্যের উপরে স্থান দিয়ে, তাকে ‘সময়’ দেয়াটা ‘সৎকাজ’ বলে গণ্য হতে পারে। যাহোক, তৃতীয় শ্রেণীটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ – বুঝতে হবে দান-খয়রাত করা, মসজিদে বানানো, তসবীহ জপা, অতিথি আপ্যায়ন, মিস্কীন খাওয়ানো – এসব সৎকাজ হলেও, এগুলোকে আল্লাহ্ নাম ধরে উল্লেখ করেন নি – সবকিছু সৎকাজের ভিতর এসে যাচ্ছে – অথচ ”একে অপরের সাথে সত্য নিয়ে আলোচনা করা বা সত্য সম্বন্ধে জ্ঞানদানকে” এই আলাপ আলোচনার ব্যাপারকে – কত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যে, মানব জীবনের সারমর্মকে যে চারটি শ্রেণীভুক্তির ভিতর Narrowed down করা হয়েছে, তার ভিতর একটি হচ্ছে এই সত্য সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা, শিক্ষাদান বা পরামর্শ করা মানবশ্রেণী। তাহলে দেখুন TV দেখে সময়ক্ষেপণ করে দ্বীনের দুটো কথার ‘সময়’ নেই বলাটা কত আত্মঘাতী একটা ব্যাপার এবং কত বড় গর্হিত একটা অপরাধ। চতুর্থ শ্রেণী হচ্ছে “যারা একে অপরকে ধৈর্যের পরামর্শ দেয়” – ধৈর্যের অর্থও ব্যাপক – আপনি রেগে যাচ্ছেন, আমি আপনাকে ধৈর্য ধারণ করতে বলতে পারি, আপনার সন্তানগুলো একের পর এক মৃত্যুবরণ করে চলেছে জন্মের পর পরই – সেজন্য আপনার কাছে জীবন অর্থহীন মনে হয়, আমি আপনাকে আপনার দ্বীনী ভাই হিসেবে ধৈর্যধারণ করতে অনুরোধ করতে পারি – আপনাকে সান্ত্বনা দিতে পারি – এভাবে মুসলিম সামাজিক জীবনে ধৈর্য ও ধৈর্যের উপদেশের তাৎপর্য অপরিসীম।

তাহলে দেখুন আল্লাহর স্পষ্ট শ্রেণী চিহ্নিতকরণে, আপনি যদি এই চার শ্রেণীভুক্ত বলে নিজেকে গণ্য করতে পারেন, তবেই আপনার জীবনের একটা অর্থ রয়েছে, তা না হলে আপনার জীবন অর্থহীন এবং আপনি ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন। এই চার দলভুক্ত হবার প্রয়াসে আপনি যে ‘সময়’ ব্যয় করবেন সেটাই সার্থক – বাকী কাজে যে ‘সময়’ ব্যয় করলেন, তা যেন অনেকটা চুলার পাশে বসে আপনার গোটা জীবনের পাথেয় স্বরূপ পাওয়া টাকার সমষ্টি থেকে একটার পর একটা নোট আগুনে ছুঁড়ে দেয়ার মতই অর্বাচীনের কাজ।

মাননীয় পাঠক! আমি মনে করি, আমাকে সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল আল্লাহর ইবাদত করার জন্য! আপনি? আপনি কি মনে করেন?

Share this nice post:
Profile photo of sajiblobon

Written by

Filed under: ইসলামী প্রবন্ধ, চরিত্র / আচরন, সমকালীন অপ্রিয় প্রসঙ্গ

Leave a Reply

Skip to toolbar