Articles Comments

সরলপথ- الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ » ফিতনা /সামাজিক সমস্যা, সমকালীন অপ্রিয় প্রসঙ্গ » ব্যক্তি বন্দনার সীমারেখা

ব্যক্তি বন্দনার সীমারেখা

ইন্নাল হামদা লিল্লাহ্! ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ্!!

[লেখাটি বিশ্বাসী মুসলিম ভাইবোনদের জন্য লিখিত]

অনেকেই মনে করেন, কোন প্রয়াত বা জীবিত স্কলারের বা ‘আলেমের কাজের বা লেখালেখির মাঝে ভুল ভ্রান্তি তুলে ধরা মানে “তার গীবত করা”! কিন্তু আসলেই কি তাই? না তা নয়! বরং ঐ স্কলারের লেখা থেকে মানুষ যাতে পথভ্রষ্ট না হয়, সে জন্য পাঠককে সাবধান করাটা কখনো কখনো ওয়াজিব বা ফরজের পর্যায়ে পড়তে পারে ৷ গীবতের উপর ইমাম নববীর বিখ্যাত বইতে, কোন কোন ক্ষেত্রে কারো দোষ প্রকাশ করা যেতে পারে, সে সম্বন্ধে বলতে গিয়ে ৬টি পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন, যার ৪ নম্বরে তিনি বলেছেন:

৪. মুসলিমদের পাপ সম্পর্কে সতর্ক করা এবং উপদেশ দেয়া – এর বেশ কয়েকটি দিক রয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে: কাউকে হাদীস বর্ণনা ও সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে অনির্ভরযোগ্য ঘোষণা করা ৷ ইজমা (মুসলিম স্কলারদের ঐক্যমত) অনুযায়ী এটি করা জায়েয ৷ বরং গুরুত্বের ভিত্তিতে এটি কখনও কখনও অবশ্যকর্তব্য হয় ৷……….. আর একটি ব্যাপার হচেছ যে, যখন আপনি কোন শিক্ষার্থীকে (দ্বীনের ক্ষেত্রে) দেখেন একজন বিদ‘আতী বা পথভ্রষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করছে এবং আপনি তার ক্ষতির আশংকা করেন, তখন আপনি অবশ্যই সেই ছাত্রকে উপদেশ দেয়ার লক্ষ্যে সে ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে অবগত করবেন ৷

যা কিনা এখানে দেখতে পাবেন –
Click this link… – এছাড়া এই বিষয়ের উপর (অর্থাৎ কোন অবস্থায় কারো দোষ প্রকাশ করা জায়েজ) বলতে গিয়ে Islam-QA-এর ফতোয়াতে একই কথা বলা হয়েছে:

Warning the Muslims of someone’s evil, such as highlighting the weakness of some reporters or witnesses or authors.

যা দেখতে পাবেন এখানে –
Click this link…

এটাতো এমনিতেই বোঝা যায় যে, কোন একজন ‘আলেম, চিন্তাবিদ, বা লেখক যিনি পরলোকগমন করেছেন – আমি কি তার কোন ক্ষতি করতে পারবো? বা তার ক্ষতি করে আমার কি লাভ?? সুতরাং ব্যক্তিগতভাবে তাকে/তাদের হেয় প্রতিপন্ন করে লেখা অর্থহীন। তবে তাদের রেখে যাওয়া কাজে যদি মানুষের (মূলত মুসলিমদের) বিপথগামী হবার সম্ভাবনা থাকে, তবে অবশ্যই তা expose করতে হবে। এক্ষেত্রে একটা কথা মনে রাখলেই আর কারো কষ্ট হবার কথা নয় – আমাদের জন্য রাসূল(সা.) হচ্ছেন একমাত্র infallible ব্যক্তি – আর সবারই ভুল থাকতে পারে – অন্য কাউকেই মহামানব বা অতিমানব ভেবে নির্ভুল ভাবার কারণ নেই! ব্যস!! মুজতাহিদরা যদি সঠিক ইজতিহাদ করে থাকেন, তবে দুইটি/দ্বিগুণ প্রতিফল পাবেন – আর ভুল ইজতিহাদ করলেও একটি প্রতিফল পাবেন।

আমার ব্যক্তিগত জীবন থেকে একটা উদাহরণ দিচ্ছি। আমি Muhammad Asad-এর The Road to Mecca এবং Islam at the Crossroads এই দু’টো বই পড়ে এতই impressed হই যে, তাঁর করা কুর’আনের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা The Message of the Qur’an-এর ৫ কপি আমি বাইরে থেকে পর্যায়ক্রমে দেশে বয়ে নিয়ে আসি শ্রদ্ধেয়/শ্রদ্ধেয়া ইসলামী চিন্তাবিদদের দেবার জন্য, তথা নিজে পড়ার জন্য। ২ কপি স্বল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় পর্যায়ের ২ জন ব্যক্তিত্বকে দেই এবং নিজেও একখানা থেকে গো-গ্রাসে সব গিলতে শুরু করি। সত্যি বলতে কি The Message of the Qur’an ছিল আমার সর্বপ্রথম cover to cover পড়া কুর’আনের অনুবাদ/ব্যাখ্যা। একসময় “তাফহীমুল কুর’আন” বা “ফি যিলালিল কুর’আন” পড়তেও খুব ভালো লাগতো – পরে যখন আরো আরো অনেক বড় স্কলারদের তফসীর পড়েছি, আর, সমকালীন বড় স্কলাররা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ভুলগুলি কোথায় – তখন ভয় লেগেছে এই ভেবে যে, ভক্তির আতিশায্যে কোন একজন স্কলারকে সমালোচনার ঊর্ধে রাখতে গেলে collateral damage-এর সম্ভাবনা থাকবে। নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহর আদেশের (৬৬:৬) কথা মনে হয়েছে। তখনই মনে হয়েছে, যারা জানেন যে – একটা লেখা, বই বা প্রচেষ্টায় এমন ভ্রান্তি রয়েছে, যা কাউকে রাসূলের(সা.) পন্থার বিপরীতে পরিচালিত করে বা করতে পারে – তাদের সেই realization “পেটে ভরে না রেখে” বা “সত্য গোপন না করে”, তাদের উচিত বর্তমান/নতুন প্রজন্মকে সে ব্যাপারে সাবধান করা।

যাহোক, আমার আলোচনার পূর্বের ধারায় ফিরে যাই – The Message of the Qur’an যখন প্রথম দফায় বছর খানেক ধরে, বোঝার ও আত্মস্থ করার চেষ্টা সমেত পড়ে শেষ করি, তখন এর দোষ-ত্রুটি তেমন একটা চোখে পড়েনি বরং এর অদ্ভুত সুন্দর অনুবাদ আর যুক্তি বলতে গেলে আমাকে বিমোহিত করে! এরই মধ্যে একদিন বর্তমান বিশ্বের অনারব স্কলারদের মাঝে সবচেয়ে বড় মাপের একজন স্কলারের একটা “সিরিজ লেকচার” শুনি – বিষয় ছিল “ইসলাম ও আধুনিকতা”। সেখানে তিনি আমাদের মত গো-বেচারা ও জ্ঞানহীন “পাবলিক”-কে পথভ্রস্ট করতে পারে, এমন নামকরা কিছু স্কলারের কাজের ভুলগুলো তুলে ধরছিলেন। আমেরিকায় দেয়া ঐ লেকচার চলাকালীন সময়ে, ফ্লোর থেকে এক লোক তো তাকে গীবতের দোষে দোষী করে, “তিনি তাঁর মৃত ভাইয়ের মাংস খাচ্ছেন” – এমন সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দিলেন। তখন তিনি সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন যে, ঐ সমস্ত স্কলারদের “ব্যক্তিসত্তার” বিরুদ্ধে তার কিছুই বলার নেই – বরং আমরা সবাই আমাদের যে কোন প্রয়াত মুসলিম ভাইদের জন্য দোয়া করবো* – কিন্তু তাদের লেখায় যে লক্ষ-কোটি মানুষকে বিপথগামী করার potential রয়েছে, সে সম্বন্ধে মানুষকে অবশ্যই অবগত করতে হবে। এক পর্যায়ে তিনি Muhammad Asad-এর The Message of the Qur’an নিয়েও কথা বলেন। ঐ সময় Muhammad Asad-এর একনিষ্ঠ ভক্ত, “এই আমার” কাছে কথাগুলো খুব অস্বস্তিকর লেগেছিল। পরে পড়াশোনা করে জেনেছি/বুঝেছি যে, সময়ের সাথে সাথে কিভাবে আসাদের “লাইন বদলেছে” – ১৯৩৮ সালের Islam at the Crossroads-এর লেখক আসাদ, আর ১৯৮০ সালের The Message of the Qur’an উপস্থাপন করা আসাদের ভিতর আকাশ পাতাল তফাৎ রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকের পরে আমেরিকায় বসবাস করতে শুরু করে এবং নতুন আমেরিকান স্ত্রী গ্রহণ করে তাঁর ধ্যান ধারণায় আমূল পরিবর্তন ঘটে – তাঁর ভিতর rationalist Mu’tazila দর্শনের তথা আধুনিকতাবাদের প্রভাব স্থায়ীভাবে কার্যকর হয়। তখন আবার The Message of the Qur’an হাতে নিয়ে দেখলাম যে, আরে তাই তো! – ব্যাখ্যার জন্য তিনি সবচেয়ে বেশী যাদের তফসীরের শরণাপন্ন হয়েছেন, তারা সবাই বিতর্কিত। যামাখশারী-র – রেফারেন্স এসেছে বোধকরি সবচেয়ে বেশী – তিনি তো মুতাযিলা ধ্যান ধারণার লোক ছিলেন! তারপর এসেছে মুহাম্মদ আব্দুহ-র রেফারেন্স যাকে wikipedia-য় “the founder of the so-called Neo-Mutazilism” বলা হয়েছে। তারপর আস্তে আস্তে বুঝেছি এসবের সমস্যা কোথায় – আসাদের আক্বীদাগত মারাত্মক ত্রুটি কোথায়** – এবং কেন তাঁর The Message of the Qur’an অত্যন্ত সতর্কতার সাথে refer বা recommend করা উচিত! কিন্তু তার মানে কি এই যে, আসাদকে আমি অভিশাপ দেব – মোটেই না! ইসলামের জন্য তিনি যে বিশাল কাজ করে গেছেন তা acknowledge করবো এবং তাঁর জন্য দোয়া করবো – এবং একই সময় তাঁর মারাত্মক ভুলগুলো থেকে নিজে বেঁচে থাকবো এবং সাধ্যমত অন্যকেও বাঁচাতে চেষ্টা করবো – যেমন আল্লাহ কুর’আনে বলেছেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ …………..

“…. Help ye one another in righteousness and piety, but help ye not one another in sin and rancour: fear Allah: for Allah is strict in punishment.” (Qur’an, 5:2)
“……নেক কাজ করতে ও পরহেজগার/সংযমী হতে তোমরা একে অপরকে সাহায্য কর। তবে পাপ ও শত্রুতার কাজে তোমরা একে অপরকে সাহায্য কোর না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।” (কুর’আন, ৫:২)

মুহাম্মাদ আসাদের কাজ – বিশেষত The Road to Mecca এবং Islam at the Crossroads এখনো আমার পড়া সবময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ বইগুলোর ২ টি। Islam at the Crossroads এখনকার দুঃসময়ে টিকে থাকার চেষ্টায় রত প্রতিটি মুসলিমের পড়া উচিত। কিন্তু তাই বলে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা বা ভলোবাসা এমন হবার উপায় নেই যে, তাঁর ভুল আমার মন-প্রাণে ধারণ করে আমি কবরে যাবো। “যে কেউ যাকে ভালোবাসবে, তার সাথে সে শেষ বিচারের দিনে উত্থিত হবে (বা থাকবে)” – এই মূল নীতির আলোকে আমি অবশ্যই রাসূল(সা.)-এঁর সাথেই থাকতে চাইবো! সবারই তা চাওয়া উচিত!!!

ফুটনোট:

*যেমন কুর’আনে বলা আছে:

وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ

“And those who came after them say: “Our Lord! Forgive us, and our brethren who came before us into the Faith, and leave not, in our hearts, rancour (or sense of injury) against those who have believed. Our Lord! Thou art indeed Full of Kindness, Most Merciful.” (Qur’an, 59:10)
“যারা তাদের পরে এসেছে (পৃথিবীতে), তারা বলে: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং আমাদের সেই সব ভাইকে ক্ষমা করুন যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে এবং মু’মিনদের বিরুদ্ধ আমাদের অন্তরে হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টি করবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” (কুর’আন, ৫৯:১০)

** যেমন: তিনি মনে করতেন যে, কুর’আনে নবী/রাসূলদের যে সব কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলো আল্লাহ, প্রচলিত গল্প থেকে উদাহরণ হিসেবে পেশ করেছেন – সেগুলো সত্যিকার কোন ঘটনা হতে হবে এমন কোন কথা নেই।

লিখেছেন-শায়খ এনামুল হক, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ICD

Share this nice post:
Profile photo of sajiblobon

Written by

Filed under: ফিতনা /সামাজিক সমস্যা, সমকালীন অপ্রিয় প্রসঙ্গ

Leave a Reply

Skip to toolbar