Articles Comments

সরলপথ- الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ » ফজিলতের দিবস/ ঈদ / অনুষ্ঠান » এক নজরে ঈদুল আযহার দিনে করণীয় ও বর্জনীয়:

এক নজরে ঈদুল আযহার দিনে করণীয় ও বর্জনীয়:

আলোচনায়:

(শাইখ আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী)

প্রেসিডেন্ট: ইসলামিক এডুকেশন এন্ড রিসার্চ ফাউনডেশন

অধ্যক্ষ- মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা।

এবং আলোচক- পিস.টিভি বাংলা।

মোবাইল: ০১৭১৫-৩৭২১৬১

০১। ঈদের দিন তাকবীর পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘য়ালাকে বেশী বেশী স্মরণ করা। হাটে-বাজারে, মসজিদে-মাঠে, বাড়ীতে-ঘরে, সর্বত্র তাকবীর পাঠ করবে। পুরুষেরা উঁচু আওয়াজে পাঠ করবে, মেয়েরা নিরবে। মূলত: এ তাকবীরৎ

الله أكبر الله أكبر لا إله إلا الله، والله أكبر الله أكبر ولله الحمد.

যুলহিজ্জা মাসের এক তারিখ হতে ১৩ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত পাঠ করার সময়। (ফাতহুল বারী-২/৫৮৯, সহীহ ফিকহুস্ সুন্নাহ্-১/৬০৩ পৃঃ)।

০২। সুন্দর ভাবে গোসল করে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হবে। (মুয়াত্তা মালিক হাদীস নং ৪২৬, সহীহ)। এরপর সম্ভব অনুযায়ী সুন্দর ও মার্জিত জামা-কাপড় পরবে। (সহীহাহ হাঃ ১২৭৯)।

০৩। সকাল বেলা কিছু না খেয়ে ঈদের সালাতে যাবে, অতঃপর সালাত শেষে ফিরে এসে কুরবানীর গোস্ত খাবে, (তিরমিযী হাঃ ৫৪২, হাসান)। না খেয়ে সালাতে যাওয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত, যা ধনী-গরীব সকলের জন্য প্রজোয্য। তবে এ কিছুক্ষণ না খেয়ে থাকাকে রোযা বলা উচিত নয়, কারণ ঈদের দিন রোযা রাখা নিষেধ।

০৪। ঈদের সালাত ঈদগাহে আদায় করতে হয়। নারী-পুরুষ সকলেই ঈদগাহে ঈদের সালাত আদায় করবে। পুরুষের কর্তব্য নারীদের জন্য ঈদগাহে সালাত আদায় করার ব্যবস্থা করা। আর নারীদের কর্তব্য পূর্ণ পর্দা, শালীনতা ও সংযমতার সাথে ঈদগাহে যাবে। (সহীহুল বুখারী হাঃ ৯৭১, সহীহ্ মুসলিম হাঃ ৮৯০)।

০৫। ঈদগাহে এক পথ দিয়ে যাওয়া ও অপর পথ দিয়ে ফেরা সুন্নাত, (সহীহুল বুখারী হাঃ ৯৮৬)। সম্ভব অনুযায়ী ঈদগাহে পায়ে হেটে যাওয়াও সুন্নাত, (সহীহ ইবনু মাজাহ হাঃ ১০৭১)। ঈদগাহে পৌঁছে অপেক্ষারত মুসল্লিরা তাকবীর পাঠে রত থাকবে।

০৬। ঈদের সালাতের আগে ও পরে কোন সুন্নাত সালাত নেই। (সহীহুল বুখারী হাঃ ৯৮৯)। তবে কারণ বসত মসজিদে ঈদের সালাত আদায় করলে অপেক্ষারত মুসল্লিরা দুই রাকাআত দুখুলুল মসজিদ সালাত আদায় করে বসবে। কারণ দুই রাকাআত না পড়ে মসজিদে বসা ঠিক নয়। (সহীহুল বুখারী হাঃ ৪৪০, সহীহ মুসলিম হাঃ ৭১৪)। ঈদের সালাতে কোন আযান ও ইকামাত নেই, (সহীহ মুসলিম হাঃ ৮৮৭)। এজন্য ঈদগাহে বেশী ডাক-ডাকি করা ঠিক নয়।

৭। ইমাম সাহেব সর্বপ্রথম দু’রাকাআত ঈদের সালাত পড়াবেন। সহীহ হাদীসের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ অনুযায়ী প্রথম রাকাআতে কিরাতের পূর্বে অতিরিক্ত সাত তাকবীর এবং দ্বিতীয় রাকাআতে কিরাতের পূর্বে অতিরিক্ত পাঁচ তাকবীর দিয়ে সালাত আদায় করা উচিত। (আবূ দাউদ হাঃ ১১৫০, ইবনু মাজাহ হাঃ ১২৮০ সহীহ)।

০৮। সালাত শেষে ইমাম সাহেব খুতবাহ প্রদান করবেন, খুতবা সময় উপযোগী বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর করণীয়-বর্জণীয় এবং প্রেরণা মূলক বক্তব্য রাখবেন। মহিলারা উপস্থিত হলে তাদের বিষয়েও বক্তব্য রাখবেন।

০৯। ঈদের সালাত শেষ করে সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা আল্লাহর নামে ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কুরবানী করবেন। সামর্থ্যবানদের কুরবানী বর্জন করা উচিত নয়। সামর্থ অনুযায়ী উট, অথবা গরু অথবা ছাগল, ভেড়া,দুম্বা কুরবানী করবে। একাকী কুরবানীর সামর্থ্য না থাকলে একটি গরুতে সাত শরীকে কুরবানী দিবে। (সহীহ মুসলিম হাঃ ১৩১৮)।

১০। কুরবানীর পশু দাতাল অথবা উট পাঁচ বছর পূর্ণ হয়ে ছয় বছরে পদার্পন করেছে, গরু দুই বছর পূর্ণ হয়ে তৃতীয় বছরে পদার্পন করেছে, ছাগল এক বছর পূর্ণ হয়ে দ্বিতীয় বছরে পদার্পন করেছে, এমন বয়সের হতে হবে। (সহীহ মুসলিম হাঃ ১৯৬৩, আল মুগনী-৯/৩৪৮পৃঃ, সহীহ ফিক্হুস সুন্নাহ ২/৩৭০ পৃঃ)।

১১। কুরবানীর পশু যত সুস্থ, সুন্দর ও নিখুত হবে ততো ভালো। তবে কানা, অন্ধ, লেংরা এবং অতি রুগ্ন ও দুর্বল যেন না হয়, কারণ এমন পশু কুবানীর উপযুক্ত নয়, (নাসাঈ, ইবনু মাজাহ হাঃ৩১৪৪ সহীহ)। অনুরূপ কান কাটা ও শিং ভাংগা মুক্ত হাওয়া ভালো। (সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ-২/৩৭৩ পৃঃ)। মনে রাখতে হবে, এ কুরবানী তাকওয়ার পরিচয়। সুতরাং আপনার তাকওয়া কিভাবে প্রমাণ করবেন তা আপনিই ভাল জানেন।

১২। কুরবানীর পশু যবাহ করার সময়: ঈদের সালাত শেষ করে। অতএব কেউ যদি ঈদের সালাতের আগে কুরবানী করে ফেলে তাহলে তার কুরবানী গ্রহণযোগ্য হবে না এমতাবস্থায় তাকে আবার কুরবানী করতে হবে। (সহীহুল বুখারী হাঃ ৫৫৪৫, সহীহ মুসলিম হাঃ ১৫৫৩)। যুলহাজ্জ মাসের ১০ তারিখ হতে ১৩ তারিখ পর্যন্ত কুরবানী করা যায়, তবে সর্ব উত্তম ১০ তারিখে করা। (ফিকহুস সুন্নাহ ২/৩৭৭ পৃঃ)।

১৩। কুবানীর পশু যবাহ করার সুন্নাতী নিয়ম হল: পশুকে কিবলামুখী করে বাম কাতে শুয়ায়ে যবাহকারী কিবলামুখী হয়ে ডান হাতে তরবারী নিয়ে বামহাতে পশুর মাথা ধরে “বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবার” বলে যবাহ করবে। (সহীহুল বুখারী হাঃ ৫৫৫৮, বিস্তারিত দ্রঃ মানাসিক লি আলবানী- ৩৩পৃঃ মাজমু ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়াহ-২৬/৩০৮পৃঃ)। আমাদের কিবলা যেহেতু পশ্চিম দিকে সেহেতু পশুর মাথা থাকবে দক্ষিণ দিকে এবং পা থাকবে পশ্চিম দিকে, লেজ থাকবে উত্তরদিকে। তাহলে সুন্নাতি পদ্ধতি অনুযায়ী যবাহ করা সম্ভব হবে। ভাল ধারালো ছুড়ি দিয়ে সুন্দর ভাবে যবাহ করবে পশু যেন কষ্ট না পায় ।

১৪। কুরবানী করার পর নিজে খাবে, প্রতিবেশিদের খাওয়াবে এবং অসহায় দরিদ্রদেরকে দান করবে। সাধারণত এ তিন শ্রেণী হকদার। সুতরাং কাউকে বঞ্চিত করবে না। (সুরা হাজ্জ- ২৮ ও ৩৭, সহীহুল বুখারী হাঃ ৫৫৭০, সহীহ্ মুসলিম হাঃ ১৯৭১)। কুরবানীর চামড়া দরিদ্র ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে দান করে দিবে। (সহীহ্ ফিকহুস সুন্নাহ-২/৩৭৯পৃঃ)।

১৫। ঈদের দিনে আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে কাটাবে। পরস্পরে সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময় করবে। সাহাবায়ে কিরাম পরস্পরে হাসি মুখে সাক্ষাৎ করতেন এবং تَقَبَّلَ اللهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ (তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম) আল্লাহ আপনাদের এবং আমাদের আমল সমূহ কবুল করে নিন। এর মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। সুতরাং বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার না করে সেরূপ পরিভষায় সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময় করা উচিত। (সহীহ ফিকহুস্ সুন্নাহ-১/৬০৮)

বর্জনীয় বিষয় সমূহ

১৬। মেয়েরাও ঈদগাহে যাবে কিন্তু খুবই শালীনতা ও সংযমতার সাথে। বে-পর্দা ও অশালীন ভাবে নয়। অপর পুরুষের সাথে গল্প গুজব ও সৌন্দর্য প্রদর্শন করে নয়। ফলে সাওয়াবের পরিবর্তে আরো গুনাহগার হবে।

১৭। ঈদগাহে বা ঈদের দিন সাক্ষাত হলে মু‘য়ানিকা করতে হয় এমন বিশ্বাস ও আমল করা বিদআ‘ত। তবে দীর্ঘদিন পর যাদের সাথে সাক্ষাত হয় সালাম ও মুসাফাহার পর মু‘য়ানাকা (গলায় গলা মিলানো) অসুবিধা নেই। অনুরূপ ঈদের দিন কবর যিয়ারতের বিশেষ দিন মনে করে যিয়ারত করাও বিদআত (সহীহ্ ফিকহুস সুন্নাহ- ১/৬৬৯) তবে পূর্ব নির্ধারিত রুটিন ছাড়া হঠাৎ সুযোগ হয়ে গেলে একাকী কেউ যিয়ারত করলে দোষনীয় নয়।

১৮। প্রথমে ঈদের সালাত অতঃপর খুতবা। সুতরাং সালাতের আগে খুতবা দেয়া নিষিদ্ধ। অনুরূপ একাধিক খতীব হওয়াও নিষিদ্ধি।

১৯। কুরবানীর গোশত, চামড়া কোন কিছুই বিক্রয় করা যাবে না। অর্থাৎ বিক্রয় করে নিজে উপকৃত হওয়া যাবে না। এমনকি কসাইকে পারিশ্রমিক স্বরূপ গোশত দেয়াও নিষিদ্ধ, (সহীহুল বুখারী হাঃ ১৭১৭, সহীহ্ মুসলিম হাঃ ১৩১৭)। তবে সাধারণ ভাবে তাকে খেতে দেওয়াতে অসুবিধা নেই।

২০। ঈদের দিন উপলক্ষে ঈদমেলা যেখানে গান-বাজনা, অবাধে নারী-পুরুষ বিচরণ ইত্যাদির আয়োজন থাকে এমন মেলা আয়োজন করা, অংশগ্রহণ ও সহযোগীতা দেয়া সম্পূর্ণ হারাম। অনুরূপ ঈদ উপলক্ষে বাড়ী-ঘরে গান-বাজনার বিশেষ আয়োজন, নারী-পুরুষের বিশেষ সাক্ষাত ও অবাধে যেখানে সেখানে ঘুরাফেরা, এসবই অমুসলিমদের কালচার। মুসলিমদের জন্য সম্পূর্ণ হারাম, (সূরা আলি ঈমরান-১৪৯, সূরা লুকমান-৬,৭)। বরং মুসলিম সমাজের কর্তব্য হল আল্লাহর আনুগত্যের মধ্য দিয়ে ঈদ পালন করে তাঁকে আরো খুশি করা।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সে তাওফীক দান করুন, আমীন!

http://www.aldinalislam.com/

 

Share this nice post:
Profile photo of sajiblobon

Written by

Filed under: ফজিলতের দিবস/ ঈদ / অনুষ্ঠান

Leave a Reply

Skip to toolbar