Articles Comments

সরলপথ- الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ » সমকালীন অপ্রিয় প্রসঙ্গ » ‘উড’ সংস্কৃতির ধাক্কায় পথহারা নারী স্বাতন্ত্র্য

‘উড’ সংস্কৃতির ধাক্কায় পথহারা নারী স্বাতন্ত্র্য

[এক] আজকের দুনিয়ায় নারীকে পণ্য হিসেবে বাজারজাত করতে বিশ্ব অর্থনীতির  কথিত উন্নয়ন পরিসংখ্যান সহ অনেকের অনেক রকম অবদান বা ভূমিকা থাকলেও এক্ষেত্রে সবাইকে টেক্কা দিয়ে চলেছে হলিউড-বলিউডের সর্বগ্রাসী স্বপ্নীল থাবা। মাদকাসক্তদের মতই বিশ্ব আজ আসক্ত এই দুই ‘উড’-এর নেশায়। উন্নত প্রযুক্তির হাত ধরে এই দুই ‘উড’ সংস্কৃতি এখন সিনেমা হলের সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পরেছে মানুষের ঘরে ঘরে। পৌঁছে গেছে কচি শিশুর আঙ্গুলের ডগায়। রূপ-রং আর জৌলুষময় এই জগত দুটোতে কল্পনার ফানুস মিশিয়ে তৈরী হয় যে জীবন ব্যবস্থা সেখানে সাধারনতঃ নায়করা মরে না, নায়িকাদের রূপ-লাবণ্য কমে না। বার্ধক্য তাদের ছুঁতে পারে না। নিত্য জীবনের রোগ-শোক, দুঃখ-ব্যাধি সেখানে হানা দেয় না। অতি ভাবুক এবং কষ্ট কল্পনার সেই জীবনের স্বপ্নেই বিভোর বিশ্বের বর্তমান প্রজন্ম। জীবনকে তারা সেরকম তারুণ্যময় স্মার্ট ভাবতেই আগ্রহী। স্মার্টনেসের উল্টো পিঠে লিখা আছে যে সরলতা কিম্বা অক্ষমতা সে সম্বন্ধে তারা একেবারেই অজ্ঞ অথবা জেনেশুনে নিস্পৃহ। তাই বার্ধ্যক পীড়িত বাবা-মা তাদের কাছে আজ অগ্রহণযোগ্য। ‘উড’ স্বর্বস্ব্য ফ্যশান এ প্রজন্মের কাছে যেন স্বর্গীয় আদর্শ, তাই অবশ্য করণীয় এবং অবশ্য পালনীয়। দেহে অল্প কাপড়ের আচ্ছাদন এদের কাছে অতি দৃষ্টি নন্দন, এতে শরীর ঢাকলো না খোলা থাকলো তার বিবেচনা যেন হাস্যকর। সেজন্যেই ক্যাট ওয়াক স্টাইলে হাঁটা এদের কাছে আধুনিকতা। যেখানে সেখানে নেচে গেয়ে ওঠা এদের কাছে জীবনকে উপভোগ করার অন্যতম উপায়। এ ধরনের নৃত্যগীতের রয়েছে বিবিধ ছন্দ, বিবিধ মুদ্রা। সেগুলোর রয়েছে আবার বিবিধ গাল ভরা নাম। ট্রেনের ছাদে, গাছের ডালে, বাসের চাকায়, প্লেনের পাখায় হঠাৎ নেচে-গেয়ে উঠা যদিও এখনও ফিল্মেরই অংশ তবে প্রযুক্তির কল্যানে খুব শীঘ্রই তা নিত্য জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। পাকস্থলী ভর্তি মল-মূত্রের বোঝা নিয়ে কোন বিবেকবান, বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষে নাচের নামে যে এরকম অঙ্গ সঞ্চালন উচিত নয় তা এই ‘উপভোগ্য’ জীবনে কেউ ভাবতেও যেন রাজী নন।

এই দুই ‘উড’ সংস্কৃতির প্রসার ও কল্যানে জেনে হোক বা না জেনেই হোক, বিশ্বময় কাজ করে চলেছে অসংখ্য অধিকার প্রত্যাশীর দল। এদের মধ্য রয়েছে সমকামীদের দল, নগ্নবাদীদের দল, বিবাহ প্রথা উচ্ছেদকামীদের দল ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে শত-সহস্র এই সব বিবিধ দলাদলির মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ কণ্ঠ হলো নারীবাদীদের দল। এদের অভিযোগ নারী আজ নির্যাতিত ও অবরূদ্ধ। তাই এদের মুক্ত করতে হবে। আনতে হবে মূল কর্ম স্রোতে, করতে হবে ক্ষমতায়ন। পুরুষের মতই একই রকম কাজকর্ম করে আয়-রোজগার করবে, হবে স্বাবলম্বী এবং সমপরিমান ক্ষমতাবান। অবরূদ্ধ নারীকে অবমুক্ত কারার অন্দোলন যে কোন বিবেচনায় যুক্তিসঙ্গত। যেহেতু মানব সমাজ ও সভ্যতার মূল হচ্ছে পরিবার আর সেই পরিবারের স্তম্ভ হচ্ছে নারী তাই মানব সভ্যতার সুষ্ঠ বিকাশে শিক্ষিত নারীর ভূমিকাই প্রধান। অতএব সুসভ্য মানব সম্পদ গড়ে তোলার স্বার্থে যে কোন দেশের নারীদেরকে অবশ্যই দিতে হবে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ। অন্য দিকে সৃষ্টিগত শারীরিক বিশেষত্বের কারণে নারীর স্বাস্থ্য সেবাকেও দিতে হবে ততোধিক গুরুত্ব। এজন্যে দেশে থাকতে হবে পর্যাপ্ত সংখ্যক নারী চিকিৎসক, থাকতে হবে প্রচুর নারী স্বাস্থ্যকর্মী। যারা স্কুলে, কলেজে, পাড়ায় পাড়ায় এমনকি প্রয়োজনে ঘরে ঘরে গিয়ে বিভিন্ন বয়সী মেয়েদেরকে দিতে পারবে তাদের বয়স ভিত্তিক দরকারী পরামর্শ। বিশেষ পরামর্শ দেবে বিবাহযোগ্য নারীদেরকে। এতে সেক্স এডুকেশনের নামে স্কুল-কলেজে ঢালাও ভাবে প্রজনন বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজন হবে না। নারীদের এই স্বাস্থ্য সেবা বিস্তৃত ও সহজলভ্য করা প্রয়োজন গ্রামের কিষাণী পর্যন্ত। কৃষি আর খেত-খামারের কাজ হলো ‘ইউনিসেক্স ওয়ার্ক (unisex work)’, এখানে নারী-পুরুষ সবাইকেই ঘরে-বাহিরে কাজ করতে হয় সমান তালে। আমেরিকার মত উন্নত দেশও এক্ষেত্রে কোন ব্যতিক্রম নয়। এখানেও যারা কৃষিকাজ করেন তাদের পুরো পরিবারই সাধারনতঃ জড়িত থাকেন ঐ কাজে। আমাদের দেশের কৃষক পরিবারেরা বিশেষতঃ এসব পরিবারের নারী ও শিশুরা সব সময়ই বঞ্চিত থাকছে নূন্যতম স্বাস্থ্য সেবা থেকেও। অথচ এদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা না গেলে শহর ভিত্তিক কর্পোরেট আর শো-বিজ ব্যবসায়ীদের না খেয়ে মরা ছাড়া গতি থাকবে না।

তাই নারী শিক্ষা ও কর্ম সংস্থানের প্রধান ক্ষেত্রই হতে হবে মেডিক্যাল সায়েন্সেস এবং স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান। নারীর জন্যে অবারিত ও সহজসাধ্য করতে হবে ডাক্তারী, নার্সিং আর স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ক যাবতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা। তাদের জন্য আরেকটা অতি আবশ্যক কর্মক্ষেত্র হলো কিন্ডারগার্টেন এবং বাচ্চাদের প্রাথমিক শিক্ষা। এসব ক্ষেত্রে মেয়েদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয়তা সর্বজনীন। অল্প শিক্ষিত নারীদের জন্যে পোশাক শিল্প, কুটির শিল্প নিঃসন্দেহে অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবীদার। পোশাক শ্রমিকদের সম্মানজনক জীবন ও জীবিকার স্বার্থে এই শিল্প অঞ্চলগুলো ঘিরে নারীদের জন্যে নির্দিষ্ট বাস সার্ভিস তথা নিরাপদ ও নিশ্চিত গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকা অত্যাবশ্যক। কাজের এই ক্ষেত্রেগুলো পুরুষদের নূন্যতম সুপারভিশনের ভিত্তিতে পুরোটাই ছেড়ে দেয়া যেতে পারে নারীদের একক ম্যানেজমেন্টে।

কিন্তু এসব দিকে নজর না দিয়ে  আজকের নারীবাদীরা লিপ্ত অলীক সব স্বপ্ন বিলাসে। নিজেদের অজান্তেই তারা যেন আজ হয়ে উঠছেন ‘উড’ সংস্কৃতির অন্যতম বাহক, প্রচারক ও পরিপূরক। আন্দোলনের দাবী যেখানে সম্মানের সাথে সমতার ভিত্তিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীর কর্ম সংস্থান সেখানে নারী আজ বিশ্বব্যাপী নির্বিচারে ব্যবহূত হচ্ছে মানুষের আদিম লালাসাকে উস্কে দিয়ে ভোগ্য পণ্য বিক্রির প্রধানতম মাধ্যম ও হাতিয়ার হিসেবে। হলিউড-বলিউড ভিত্তিক শক্তিমত্ত মিডিয়ার দাপট আজ এতটাই সর্বগ্রাসী যে বিশ্বের দেশে দেশে সরকারি উদ্যোগেই এখন নারীকে উন্মোচিত উপস্থাপন করা হচ্ছে যে কোন ধরনের বিপণন বাণিজ্যে। এমনকি আপাতঃ নিষ্কলুষ খেলাধুলার ফাঁকে ফাঁকেও নারীকে আজ ছেড়ে দেয়া হচ্ছে দেহ ভিত্তিক উত্তেজক উপস্থাপনায়। জিমনাস্টিকের পুরুষ প্রতিযোগী যেখানে ট্রাউজার পড়া, খোলা ময়দানের অনুষ্ঠানে পুরুষ সহযোগী যেখানে স্যূট-টাই পড়া সেখানে নারী থাকছে উলঙ্গ প্রায়। সাঁতার, টেনিস, ভলিবলের মত বিবিধ ক্ষেত্রে নারীকে আজ এমন ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যা কোন যুক্তিতে আসে না। শুধু ইচ্ছা করলেই এসব ক্ষেত্রে নারীকে আরও পরিশীলিত ভাবে উপস্থাপন সম্ভব। আরও সম্ভব নারীদের প্রতিযোগীতায় পুরুষের অপ্রয়োজনীয় উপস্থিতি পরিহার করা। কিন্তু এসব বিবেচ্য না হওয়ার পেছনে নারী দেহের প্রদর্শনীই যে লক্ষ্য তা বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না।  নারী দেহের আজকের এই সব উলঙ্গ উপস্থাপনা আদিম কালের যৌন দাসত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় বারবার। অথচ নারীত্বের এই বিশ্বজনীন অপমানে নারীবাদীরা কেন যে নীরব তা ভাবতে গেলে রীতিমত বিস্মিত হতে হয়।

এই নীরবতার কারণ খুঁজতে গেলে হলিউড, বলিউড এবং নারীবাদী নেতৃত্বের মাঝে অদ্ভুত কিছু যোগ-সাজোশ লক্ষ্য করা যায়। আজকের উড সংস্কৃতি এবং নারী সংগ্রামের প্রথম সারিতে দেখা যায় যে নারীদের তাদের বেশির ভাগই প্রচলিত বিবাহ বন্ধন বা সমাজ-সংসারের বাসিন্দা নন। এমনকি তাদের অনেকে এই সংসার প্রথাতেই বিশ্বাসী নন। তাই তাদের কোন সন্তান নাই। তারা কোন সন্তানের মা নন। বিবিধ স্ব-অর্পিত শারীরিক আচার-অণুশাসনের কারণে তারা অনেক ক্ষেত্রে সন্তান ধারনেও হয়ে থাকেন অক্ষম। অথবা বিকৃত সুখ-সম্ভোগ স্বর্বস্ব্য জীবনের লোভে এরা কখনোবা নেমে যান পশুদেরও নীচে হয়ে থাকেন ঘৃণ্য সমকামী। এহেন অবস্থায় তারা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিতে পারেন কিনা অথবা বিশ্ব নারীর আইডল হতে পারেন কিনা সে প্রশ্ন রয়েই যায়। কারণ জন্মগত কোন অসম্পূর্নতা না থাকার পরও যে নারী মা হতে পারলেন না তিনি তো পূর্ণাঙ্গ নারীই নন, সেই তিনি কি ভাবে দেবেন নারীর নেতৃত্ব? তিনি কি ভাবে বুঝবেন সন্তান ধারন ও জন্মদানের কষ্টকর স্তরসমূহ? কি ভাবে জানবেন সন্তান ও মায়ের সম্পর্ক এবং তাদের পারস্পরিক প্রয়োজন ও অধিকার? তত্ত্ব দিয়ে পৃথিবীর অনেক কিছু বোঝা গেলেও মাতৃত্ব তো কোন তাত্ত্বিক বিষয় নয় যে শুধু পড়াশোনা করলেই প্রাজ্ঞ হওয়া যাবে।

[দুই]

নারীবাদী নেতৃত্বে এই অসম্পূর্ণ নারীরা থাকার কারণেই মূলতঃ বিশ্ব নারীর সমস্যা আজ সমাধানের বদলে বরং বেড়ে চলেছে দিন দিন। এদের ভুল মূল্যায়ন ও উপস্থাপনের কারণে নারীত্বের জন্য অপমানজনক ক্ষেত্রগুলো রয়ে যাচ্ছে অনুচ্চারিত, ভুল ভাবে পদায়ন করা হচ্ছে নারীকে যাতে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যা। এদের সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে নারীর স্বকীয় স্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার ও অবজ্ঞা করে গলার জোরে তাকে পুরুষের সমশক্তি সম্পন্ন হিসেবে উপস্থাপন করা। এতে নারী বাধ্য হচ্ছে একই কাজ ও পদের জন্য সরাসরি পুরুষের সাথে প্রতিযোগীতায় নামতে। অথচ কোন ক্রীড়া প্রতিযোগীতাতেই কিন্তু নারীকে সরাসরি পুরুষের সাথে কখনও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হয় না। পুরুষের প্রেক্ষাপটে নারীর দুর্বলতাকে সেখানে ঠিকই মূল্যায়ন করা হয়। তাহলে কর্মক্ষেত্রে কেন তাকে মিলিয়ে-গুলিয়ে ফেলা হবে পুরুষের সাথে? এখানে কেন ক্ষুণ্ণ হবে তার স্বকীয় স্বাতন্ত্র্য ও অধিকার? অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় নারীর হাতে কিছু অর্থ তুলে দিতে পারলেই যেন মিটে যাবে নারীদের সব সমস্যা আর সেটাই যেন নারীবাদী নেতৃত্বের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং একমাত্র চাওয়া।

কিন্তু এরা কখনই বলছেন না যে নারীরা কেন ঘরে-বাহিরে দুই জায়গাতেই শ্রম দেয়ার ‘ডাবল প্রেসার’ নেবে? তারা বলছেন না যে মায়ের কোলের উপর নবজাতকের যে অধিকার তা থেকে সন্তান কেন অকালে বঞ্চিত হবে? মা কর্মজীবী হওয়ার কারণে জন্মমাত্রই মায়ের স্নেহে বড় হওয়ার অধিকার খুইয়ে বেড়ে উঠবে যে সন্তান সে যে স্বাভাবিক মানুষ হবে না তা বুঝতে খুব একটা বিদ্যার দরকার হয় না। বেবী ফর্মূলা যেমন মায়ের দুধের বিকল্প হতে পারে নি তেমনি ডে-কেয়ার, কেয়ার টেকার আর আয়া-বুয়ার পক্ষেও মায়ের বিকল্প হওয়া সম্ভব নয়। তাই এদের হাতে বড় হওয়া এই আজন্ম বঞ্চিতরা কখনই জানবে না যে মা কি জিনিস আর তাকে কিভাবে সম্মান করতে হয়। এরা জানবে না যে মা ও নারী একই জাতি। তাই ইভটিজিং করতে এরা লজ্জিত হবে না। নারীর অসম্মান এদের বিবেককে নাড়া দেবে না। মানসিক ভাবে অপুষ্ট আগামীর এই প্রজন্মগুলোকে সামলাতে কত অর্থ লাগতে পারে এবং এদের দ্বারা দেশের অর্থনীতির সামনে এগুবে না পেছনে যাবে সে হিসাব কেউ কখনও করেছেন বলে শুনি নি। অথচ এই পরিসংখ্যান ছাড়া নারীকে নির্বিচারে ঘর ছাড়া করে, তাকে দিয়ে উৎপাদন ডাবল করে ‘দেশের অর্থ বৃদ্ধি পাচ্ছে’, ‘দেশ সমৃদ্ধ হচ্ছে’ এমন দাবী কখনও যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে না। শুধু  মাতৃকালীন ছুটিকে ছয় মাস লম্বা করে সামাজিক এই বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়। কারণ মাতৃত্ব কোন খন্ডকালীন বিষয় নয়। মায়ের পূর্ণ সুস্থতা এবং সন্তানের পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশের স্বার্থে মাতৃকালীন অবকাশ হওয়া উচিত কমপক্ষে দুই বছর। প্রতিটি মাকে তার কাজ থেকে দেয়া উচিত দুই বছরের পূর্ণাঙ্গ অব্যহতি। এই সময়ের জন্য মাকে এককালীন অর্থ সহায়তা দিয়ে এবং দুই বছরের মেয়াদান্তে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাকে পুণঃ কাজে নিয়োগের শর্ত স্বাপেক্ষে খুব সহজেই সম্ভব শিশুর পাশে মায়ের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এতে যেমন পূরণ হবে মা ও নবজাতকের পারস্পরিক প্রয়োজন তেমনি মিটবে নতুন প্রজন্মের মানসিক চাহিদাও।

আজকের কর্মক্ষেত্রেগুলোতে নারীর এই স্বকীয় স্বাতন্ত্র্যহীনতার কারণে শুধু আমাদের আগামী প্রজন্মই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে না বরং ক্ষতিগ্রস্থ হছে স্বয়ং নারীও। সৃষ্টিগত শারীরিক চক্রের কারণে নারীর মনোস্তত্ত্বে অনবরত ওঠা-নামা করে যে স্বাভাবিক চিত্ত দুর্বলতা তার সুযোগ নিতে কখনই ভুল করছে না সুযোগ সন্ধানী চতুর পুরুষেরা। দেশ, সমাজ বা প্রতিষ্ঠানের ইস্পাত দৃঢ় সুকঠিন আইন-কানুনও রুখতে পারছে না কর্মজীবী নারীদের অসহায় নারীত্বের উপর পুরুষের রুচিহীন এই আধিপত্যকে। তাই বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত রাষ্ট্রীয় অফিস হোয়াইট হাউজে দেশের প্রেসিডেন্টের মত বসের কাছেও সম্ভ্রম হারাতে বাধ্য হচ্ছে মনিকার মত সহকর্মীরা। বিশ্বখ্যাত এই কেলেংকারীর পর দুনিয়াব্যাপী অফিস-আদালতে কর্মরত কর্পোরেট নারী কর্মীদের দুরবস্থা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বেতনের সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে নারীর এমন বিশ্বজনীন অপমান ও সম্ভ্রমহানী রোধে নারীবাদীরা কোন অন্দোলন করছেন বলে শোনা যায় নি। অবস্থা দৃষ্টে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে আজকের নারীবাদী নেতৃত্ব সম্ভবতঃ হলিউড-বলিউড রাজত্বকারী সেইসব চতুর, লোলুপ ও নষ্ট পুরুষদেরই সহযোগী যাদের জীবনের মূল লক্ষ্যই হলো নারীকে অসহায় অবস্থায় ফেলে ভোগ করা এবং নিজেদের ক্ষুদ্র ব্যক্তি চাহিদা পূরণের স্বার্থে নারীকে বিশ্বব্যাপী ভোগের সামগ্রী হিসেবে উপস্থাপন করা। সম্ভ্রান্ত নারীকে নির্বিচারে ঘরের বাহিরে আনতে না পারলে তাদের এই সাধ যে পূরণ হবার নয়। এতে দুনিয়াব্যাপী  জাতি, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে নারীর জন্মগত স্বাতন্ত্র্য ও সম্মান যে কিভাবে ভূলুন্ঠিত হচ্ছে তা তাদের কখনই বিবেচ্য ছিল না, এখনও নেই। কথায় বলে ‘মেয়েরাই মেয়েদের বড় শত্রু’ আজকের নারীবাদী নেতৃত্বের আচরণ সে কথাই যেন প্রমাণ করে চলেছে বারবার।

পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টির আছে জন্মগত স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা। এমনকি একটি নদী বা সাগরের যে প্রবাহ তাও অন্য নদীর অন্য সাগরের প্রবাহ থেকে আলাদা। এরা বয়ে চলে একই সাথে, পাশাপাশি। কিন্তু বজায়ে রাখে নিজ নিজ চরিত্র, আভিজাত্য ও স্বকীয়তা। এদের মাঝে থাকে ইস্পাত দৃঢ় এক দেয়াল যা চোখে দেখা যায় না। মানুষের ক্ষমতা নাই আল্লাহ প্রদত্ত সেই দেয়াল ভেঙ্গে দুই নদীর প্রবাহকে একাকার করে দেয়ার। নারী আর পুরুষও আল্লাহ সৃষ্ট এমনই দুই স্বকীয় ধারা। এরা পাশাপাশি চলবে স্বতন্ত্র ভাবে, একে অপরের থেকে উপকৃত হবে আপন নির্দিষ্ট ধারা বজায়ে রেখে এটাই উদ্দেশ্য। কিন্তু মুশকিল হলো সাগর আর নদীর পানির মত মানুষ কোন সুবোধ সৃষ্টি নয়। মানুষের রয়েছে নিজস্ব চিন্তা এবং স্বল্প পরিসরে হলেও তা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা। তাই মানুষ চাইলে ক্ষেত্র বিশেষে ভেঙ্গে ফেলতে পারে নারী-পুরুষের মধ্যকার স্বাতন্ত্র্যের দেয়াল। চাইলেই সে বাস করতে পারে একত্রে এক ঘরে, এক ছাদের নীচে কারো কোন অনুমতি ছাড়াই। মিলিত হতে পারে যেখানে-সেখানে কোন আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করেই। চাইলে কাপড় পড়তে পারে আবার নাও পড়তে পারে। তবে মানুষ যাই করুক না কেন তার পরিণতিও ভোগ করতে হয় তাকেই। যেমন মানুষের ক্ষমতা আছে মুখের থুথু নীচে না ফেলে উপরে ছুঁড়ে মারার। সে ইচ্ছা করলেই তা করতে পারে কিন্তু সে ক্ষেত্রে নিজের চেহারায় তা ধারন করতে হয় তাকেই। কারণ উপরে নিক্ষিপ্ত থুথু নিজের চেহারা বরাবর ফেরত আসবে এটাই সর্বজনীন নিয়ম। আজকের দুনিয়ায় ‘উপরে ছুঁড়ে মারা থুতু নিজের চেহারায় ধারন করার’ সেরা উদাহরণ হলো বলিউডের বাজারজাতকারী দেশ ভারতের রাজধানী ‘নিউ দিল্লী’। নিজেদের মন্দির ও দেবালয় ভিত্তিক রগরগে যৌন সংস্কৃতিকে সিনেমার আড়ালে বিশ্বায়ন করতে গিয়ে এদের নিজেদের এই প্রাধান নগরীই এখন পরিণত হয়েছে ‘ধর্ষণের রাজধানী’ শহরে। এটা এখন এমনই এক ঘৃণ্য শহর যেখানে ছুঁড়ি-বুড়ি কেউই এখন আর নিরাপদ বোধ করে না এমনকি প্রকাশ্য দিবালোকেও। একেই বলে ‘ওস্তাদের মার শেষরাতে’, একেই আমরা বিশ্বাসীরা বলে থাকি আল্লাহর অমোঘ বিধান, যা খন্ডানোর ক্ষমতা কোন মানুষের নেই।

মানুষের নিজেদের অজ্ঞতায় আজ যেমন ভেঙ্গে পড়েছে বিশ্ব পরিবেশ, তেমনি নারী-পুরুষের অদৃশ্য দেয়াল উচ্ছেদের জন্যেও তাকে আজ হাতে নাতে দিতে হচ্ছে মাশুল। বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড কালচারে গা ভাসিয়ে নিজের বর্তমানকে উপভোগ করতে গিয়ে মানুষ আজ নিজে হাতে হত্যা করছে তার নিজের ভবিষ্যতকে। এ কারণে শুধু ‘টিন প্রেগনেন্সি’ বা ‘অপুষ্ট আগামী প্রজন্মের’ই সৃষ্টি হচ্ছে না বরং এতে করে নারী তাদের সৃষ্টিগত দুর্বলতার কারণে পুরুষের চেয়ে দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে বিবিধ শারীরিক রোগ-ব্যাধিতে। অন্যদিকে একে অপরের কাছে সুলভ হওয়ার কারণে দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে নারী-পুরুষের অতি প্রয়োজনীয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আকর্ষণ ও প্রয়োজন যার প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপ-জাপানের মত উন্নত দেশেগুলোতে আজ জন্মহার নেমে যাচ্ছে বিপদজনক ভাবে। আমেরিকার সাদা জনগোষ্ঠীর জন্মহারের অবস্থাও একই রকম নাজুক। যদিও হিসপানিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্মহার এখানে বেশী কিন্তু দুর্দমনীয় ‘ফ্রি মিক্সিং’-এর কারণে এদের নব প্রজন্মের অধিকাংশই রয়ে যাচ্ছে প্রকৃত মা-বাবার পরিচয়হীন ফলে এরা ভুগছে চরম মানসিক অবসাদ আর অসুস্থতায়, যার প্রকাশ ঘটছে প্রতিদিনের ‘গ্যাং ভায়োলেন্সে’। উগ্রতা, ব্যভিচার ও সহিংসতার বিচারে এরা আমেরিকার অন্যসব জনগোষ্ঠীকে এখন প্রায় ছাড়িয়ে গেছে। ইনফরমেশন টেকনোলোজীর এই যুগে এসব তথ্য-উপাত্ত এবং এই অবস্থার মূখ্য কারণ আজ আর কারো অজানা নয়। পশ্চিমা দেশগুলোকে রীতিমত যুদ্ধ করতে হচ্ছে এই সব ক্রমবর্ধমান সামাজিক রোগ, শোক ও ব্যাধির বিরূদ্ধে। এরা এখন সরকারি পর্যায়ে দেশের তরুণ সমাজকে উৎসাহ দিচ্ছে সন্তানের প্রকৃত বাবা-মা হয়ে সত্যিকারের  সংসার গড়ার জন্যে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রী, নারী-পুরুষদেরকে জন্যে প্রবর্তন করছে কঠোর ‘ড্রেস কোড’। সেই সাথে ‘সেক্স প্রিডেটরস’ (sex predators) বা ‘যৌন দস্যূ’দের বিরূদ্ধে সংগ্রাম করছে রীতিমত ‘ডেটা বেস’ তৈরী করে। প্রতিনিয়ত আপডেট করতে হচ্ছে এইসব ‘ডেটা বেস’ কারণ প্রতিদিনই এখানে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন দস্যূ। চব্বিশ ঘন্টার নিবীড় নজরদারীও ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না এক্ষেত্রে নতুনদের আগমন ও উত্থান। এমন কি বিল ক্লিনটনের মত প্রেসিডেন্টকেও একদা দেখা গেছে এদেরই কাতারে। নিজেদের উন্নত টেকনোলোজী এবং কঠোর আইনী কাঠামোর কারণে এসব দেশ এখনও চালিয়ে যেতে পারছে এই যুদ্ধ। ঠেকিয়ে রাখতে পারছে প্রকাশ্য বিপর্যয়। যেনতেন প্রকারে হলেও টিকিয়ে রাখতে পারছে তাদের সামাজিক কাঠামো। কিন্তু ধ্বংস ঠেকাতে পারছে না আমাদের মত চাল-চুলোহীন দেশগুলো। আর যেহেতু আমাদের মত দেশগুলোতেই আজকের পৃথিবীর বেশীর ভাগ জনগোষ্ঠীর বাস তাই বিশ্বব্যাপী আজ অতি উৎকট ভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে হলিউডি নগ্নতার ভয়াল প্রতিক্রিয়া।

এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের মত দেশগুলোতে শুধু ইভটিজিং নয় বরং খুব শীঘ্রই হয়তো পশু-পাখীর মত অবাধ ও প্রকাশ্য যৌনাচারে লিপ্ত হতে দেখা যাবে আমাদের আপামর জনগোষ্ঠীকে। মহাবিপর্যয়কর এই পরিস্থিতিতে শান্তি প্রিয় বিবেকবান মানুষের পিঠ আজ ঠেকে গেছে দেয়ালে। এ থেকে মানব জাতিকে বাঁচাতে প্রকৃতি তথা আল্লাহর অমোঘ বিধানে সশ্রদ্ধ চিত্তে ফিরে যাওয়া ছাড়া যে আর কোন উপায় নেই সে কথা হারে হারে টের পাচ্ছেন আজ সবাই।

লিখেছেন- মঈনুল আহসান, লস এঞ্জেলস, ইউএসএ

Share this nice post:
Profile photo of sajiblobon

Written by

Filed under: সমকালীন অপ্রিয় প্রসঙ্গ

Leave a Reply

Skip to toolbar