Articles Comments

সরলপথ- الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ » Islamic Books » ইসলামের পুনর্জাগরন অথবা ক্রান্তিলগ্ন- মুহাম্মদ আসাদ (বারবার পড়ার মত যে বইটি)

ইসলামের পুনর্জাগরন অথবা ক্রান্তিলগ্ন- মুহাম্মদ আসাদ (বারবার পড়ার মত যে বইটি)

বিসমিল্লাহির রাহমানি রাহিম।

আস সালামু ‘আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

বইখানা ১৯৩৪ সালে লেখা । অনেকের কাছেই ইসলামের উপর পড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি বইয়ের একটি হবে এই বইটি। এই বইয়ে বহু প্যারাগ্রাফ আছে, যা থেকে কোন বুদ্ধিদীপ্ত পাঠক চাইলেই একটা গোটা পুস্তক রচনা করতে পারবেন অনায়াসে। কোন “ইসলামী ভাব সম্প্রসারণের” আয়োজনে, চাইলে, এই বইটির শত শত বাক্যকে ব্যবহার করা যেত। যাহোক আমরা ইনশাআল্লাহ এই বই থেকে কেবল কিছু অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক নির্বাচিত প্যাসেজ আলোচনা করবো – excerpts বলতে পারেন।

বইখানির নাম: Islam at the Crossroads আর লেখকের নাম: Muhammad Asad। এই বইখানি পাওয়া যায় London-এর Dar al-Taqwa থেকে। তবে আমাদের দেশেও এখন ভারতীয় “পাইরেটেড” প্রিন্ট পাওয়া যায়। এই কপিটা ১৯৮৭ সালের revised edition। আর Muhammad Asad ১৯৯২ সালে মারা গিয়েছেন ৯২ বছর বয়সে! অনেকেই হয়তো জেনে থাকবেন – তবু, যারা জানেন না, তাঁদের অবগতির জন্য: Muhammad Asad ছিলেন অস্ট্রীয়-জার্মান জাতীয়তার একজন ইহুদী (যদিও তাঁর জন্মস্থান এখনকার পোল্যান্ডের অংশ)। ১৯০০ সালে জন্মগ্রহণ করা Leopold Weiss-এর বয়স যখন ২২+, তখন তৎকালীন প্যালেস্টাইনে বেড়াতে এসে তিনি আরবদের ইসলামভিত্তিক জীবনযাত্রার ধরন দেখে অভিভূত হন এবং তারই পথ ধরে অল্প ক’বছরের মাঝেই (১৯২৬ সালে) ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর ইসলামের হয়ে তিনি অনেক কাজ করেন। তাঁর লেখা The Road to Mecca, Islam at the Crossroads ইত্যাদি বই-পত্রকে যুগান্তকারী বললেও বুঝি কম বলা হবে। আমরা ইনশাআল্লাহ দেখবো যে, এখন থেকে প্রায় ৭৭ বছর আগে লিখিত Islam at the Crossroads বইয়ে আসাদ মুসলিম উম্মাহর স্থবিরতা, অথর্বতা ও দুবর্লতার জন্য দায়ী যে রোগগুলো চিহ্নিত করেছিলেন এবং সেগুলোর জন্য যে প্রেসক্রিপশন দিয়েছিলেন – আমরা আজো সেই রোগগুলোই বুঝে উঠতে পারি নি – প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চিকিৎসার কথা না হয় বাদই দিলাম! আসুন তাহলে Islam at the Crossroads থেকে কিছু অংশ পড়া যাক এবং তা নিয়ে কিছু ব্যাখ্য বিশ্লেষণ করা যাক।

 এই সংস্করণের  নতুন করে লেখা মুখবন্ধে মুহাম্মদ আসাদ বলেন:

 What I had in mind when I wrote this book was a re-awakening of the Muslims’ consciousness of their being socially and culturally different from the all-powerful Western society, and thus a deepening of their pride in, and their desire to preserve, such of their own traditional forms and institutions as would help them to keep that essential “difference” alive and make them once again culturally creative after the centuries of our community’s stagnation and intellectual sterility.(Tangier 1982, page# 7-8, Author’s Note)

 তিনি বলছেন: তিনি যখন বইটি লেখেন, তখন তিনি মুসলিমদের এই ব্যাপারে সচেতন করতে চেয়েছিলেন যে, তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পশ্চিমা সমাজের চেয়ে ভিন্ন। আর তিনি চেয়েছিলেন সেই সুবাদে, তাদের নিজেদের ঐতিহ্য ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে তাদের গর্ববোধ এবং সেগুলোকে সংরক্ষণ করার ব্যাপারে তাদের আকাঙ্খা যেন আরো গভীর হয় – যাতে সেই অত্যাবশ্যক “পার্থক্যটা” জীবন্ত থাকে এবং তারা যেন, শত শত বছরের স্থবিরতা ও বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে আরেকবার সাংস্কৃতিক বিষয়ে সৃজনশীল হয়ে ওঠে!

 এরপর মুহাম্মদ আসাদ ঐ মুখবন্ধে আরো বলেন যে, তার মানে এই নয় যে, তিনি সবাইকে গণহারে অতীতের জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন বা অতীতমুখী করতে চাইছেন। বরং তিনি চাইছেন, তারা যেন “কুর’আন ও সুন্নাহ”য় এবং “কুর’আন ও সুন্নাহ”-র উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে ফিরে যান। আমরা এখানে একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ তুলে ধরতে পারি। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসাবে এবং নিজেদের দ্বীন-ধর্মকে সম্ভাব্য বিকৃতি থেকে রক্ষা করতে, আজ থেকে প্রায় দেড় শত বছর আগে, ১৮৬৬ সালে দেওবন্দের “দারুল উলুম” মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। অক্বীদাহ্ ও মানহাজের অনেক ভুল-ভ্রান্তি থাকলেও, ভারতীয় মুসলিমদের জন্য মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতারা একটা প্ল্যাটফর্ম উপহার দিতে পেরেছিলেন – যে কোন ধর্মীয় সংকটে মানুষ তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতো – কি করতে হবে জানতে চেয়ে। কিন্তু আজ আমরা, বর্তমান-সময়ে-জীবন-যাপন-করা ও ইসলামের-পুনর্জাগরণের-চিন্তা-ভাবনা-করা মুসলিমরা যদি অতীতে ফিরে গিয়ে দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠলগ্নের পরিবেশ/প্রতিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি, তবে তা আমাদেরকে আরো স্থবির ও মৃতপ্রায় একটা অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে। তার পরিবর্তে যে কোন পুনর্জাগরণের চিন্তায় আমাদের উচিত মূলে অর্থাৎ “কুর’আন ও সুন্নাহ্”য় ফিরে যাবার চেষ্টা করা। এখানে ইমাম মালিকের (রহ.) একটা বিখ্যাত “আসার” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য – তিনি বলেছিলেন:

 “The affairs of the later part of this ummah can never be corrected except with that which corrected the affairs of the early generations of this Ummah.”

অর্থাৎ,

“এই উম্মাহর পরবর্তী অংশের জীবনযাত্রা কখনোই শুদ্ধ করা যাবেনা কেবল মাত্র ঐসব (নীতি/পদ্ধতি) ছাড়া, যা এই উম্মাহর প্রথম প্রজন্মগুলোর জীবনকে শুদ্ধ করেছিল।”

এরপর ১৯৩৪ সালের লেখা Islam at the Crossroads বইয়ের মূল “পূর্বকথা” বা Foreword-এ মুহাম্মাদ আসাদ, ২২+ বয়সে তিনি যখন প্রথম মুসলিমদের সাথে, মুসলিম সমাজের সাথে এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে পরিচিত হলেন, তাঁর তখনকার অনুভূতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:

 “I saw before me a social order and an outlook on life fundamentally different from the European; and from the very first there grew in me a sympathy for the more tranquil – I should rather say more human – conception of life, as compared with the hasty, mechanized mode of living in Europe…… ….At the time in question, that interest was not yet strong enough to draw me into the fold of Islam, but it opened to me a new vista of a progressive human society, organized with a minimum of internal conflicts and a maximum of real brotherly feeling.” (Page#10, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

 তিনি বলছেন: “আমি আমার সামনে এমন একটা সামাজিক বিন্যাস ও জীবনের প্রতি এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গী/মনোভাব দেখতে পেলাম, যা মৌলিকভাবেই জীবনের প্রতি ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গীর চেয়ে ভিন্ন; আর প্রথম থেকেই আমার ভিতর ঐ অধিকতর প্রশান্ত – অথবা, আমি বরং বলবো যে ইউরোপীয় ত্রস্ত ও যান্ত্রিক জীবনযাত্রার চেয়ে, জীবনের প্রতি অধিকতর মানবিক – ঐ দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতি একটা মমতা জন্মাতে শুরু করে। ……আমি যে সময়ের কথা বলছি, ইসলাম সম্বন্ধে আমার আগ্রহ তখনো এমন প্রবল হয়ে ওঠেনি যে, তা আমাকে ইসলামের জগতে অন্তর্ভুক্ত করে নেবে, কিন্তু তা আমার সামনে একটা বিকশমান মানবসমাজের দৃশ্যপট খুলে দেয় যা কিনা ন্যূনতম অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সম্ভাব্য সর্বাধিক ভ্রার্তৃত্ববোধ দিয়ে গঠিত।”

 ইসলাম সম্বন্ধে একজন পশ্চিমা, ইউরোপীয় এবং ইহুদী বিধর্মীর কি দারুণ স্নেহময় ও কোমল অনুভূতি! আপনারা যারা আসাদের The Road to Mecca পড়েছেন, তারা হয়তো জেনে থাকবেন যে, তাঁর Autobiography তথা travelogue হিসেবে লেখা ঐ বইয়ের পাতায় পাতায় সতীর্থ মানুষের প্রতি, এমন কি অচেনা মুসাফিরের প্রতি, ইসলামী সভ্যতা ও সমাজের করুণা, দয়া, ভ্রার্তৃত্ববোধ দেখে তাঁর অভিভূত হয়ে যাবার কত বর্ণনা রয়েছে! আমি প্রথম যখন ঐ বইখানা পড়ি, তখন, এমন বহু বর্ণনা আছে যা পড়তে গিয়ে, আমার জন্য অশ্রু ধরে রাখা কষ্টকর মনে হয়েছিল। আপনাদের কারো যদি তেমন না লেগে থাকে, তবে হতে পারে যে, আমি হয়তো তখন একটু বেশী মাত্রায় আবেগপ্রবণ ছিলাম, তাই ব্যাপারটা হয়তো একান্ত আমার ব্যক্তিগত দুর্বলতা ছিল। আরো একটা কারণ থেকে থাকতে পারে বলে আমি মাঝে মাঝে ধারণা করেছি – নিজে ধর্ম-কর্ম বিবর্জিত একজন মানুষ হওয়াতেই (নাউযুবিল্লাহ্) হয়তো, আল্লাহ্-প্রদত্ত ফিতরার বশবর্তী হয়ে একজন সম্ভাব্য convert-এর soul searching আমাকে সব সময় স্পর্শ করেছে – হয়তো নিজের চিন্তা-ভাবনা, অনুভব, অনুভূতি ও আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ নিয়ে নিজের ভিতরের অন্তর্দ্বন্দ্ব ইত্যাদির একটা প্রতিফলন আমি তাঁদের লেখায় দেখতে পেয়েছি ! শুধু আসাদ বলে নয় – আমি যখন প্রথম The Road to Mecca পড়ি, তখন প্রায় একই সময় আরেকজন পশ্চিমা convert – অস্ট্রেলীয় Amatullah Armstrong-এর And the Sky is Not the Limit বইখানাও পড়ি। ঐ বইখানাকেও আমার কাছে দারুণ হৃদয় স্পর্শকারী মনে হয়েছিল। ওখানেও লেখিকা ইসলামী সমাজব্যবস্থার সুন্দর দিকগুলো দেখে নিজের অভিভূত হবার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা পড়ে অশ্রু সম্বরণ করা কষ্টকর। যাহোক, তখনও এবং এখনো আমার প্রায়ই মনে হয়েছে/হয় যে, আমরা জন্মগত মুসলিমরা কিভাবে ইসলামের তথা ইসালামী মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত এই সমাজের সুন্দর দিকগুলো “মিস” করি।

কয়েকদিন আগে, প্রজন্ম হিসবে সাহাবীদের বৈশিষ্ট্যের সাথে, আমাদের বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের উপর একটা লেখা পড়ছিলাম [আপনারা হয়তো বা জেনে থাকবেন যে, একটি সহীহ্ হাদীসে রাসূল (সা.), সাহাবীদের প্রজন্মকে “সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম” বলে বর্ণনা করে গেছেন]। ঐ লেখায় একটা প্রধান পার্থক্য হিসাবে বলা হয়েছে যে, সাহাবীরা সব সময় মনে করতেন যে, আল্লাহ্ তাঁদের যে favour করেছেন, তার বিপরীতে তাঁরা যে শুকরিয়া জানান – তা পর্যাপ্ত নয়। লেখার এই পর্যায়ে প্রশ্ন আসে যে, একজন হতদরিদ্র সাহাবীর ভিতরও গভীর কৃতজ্ঞতার এই বোধটা আসতো কোথা থেকে, আল্লাহ্ তাঁকে কি এমন নিয়ামত দান করেছিলেন যে, আপাত দৃষ্টিতে দরিদ্র বা নিঃস্ব হওয়া সত্ত্বেও তিনি ভাবতেন আল্লাহ্ তাঁকে অশেষ করুণা করেছেন! তখনই প্রশ্ন এসে যায় পৃথিবীর এই জীবনে, একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পাওয়া কি? বা, তার উপর বর্ষিত আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত কি? আমরা মুসলিমরা হয়তো অনেকেই এর উত্তর জানি না বা এসব নিয়ে ভাবার সময়ও আমাদের নেই। খালেদা-হাসিনা কি করলেন? নিজামী যুদ্ধাপরাধী কি না? মাহমুদুর রহমান কি রকম ঝলসে উঠেছেন? ক্রিকেট খেলায় প্রিয় দল জিতলে, কোন নায়িকা বিবস্ত্র হবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন? এসব ভাবতে ভাবতে আর জানতে জানতেই আমাদের জীবন আর জীবনের সময় দু’টোই শেষ! সাহাবীরা ভাবতেন: “ঈমান” হচ্ছে আল্লাহর তরফ থেকে তাদের দেয়া শ্রেষ্ঠতম উপহার বা নিয়ামত – যা না হলে তারা চিরকালের তরে নিশ্চিতভাবে জাহান্নামী হতেন, আর যা “নসীব” হওয়াতে অসীম-অফুরন্ত পরকালের সময় ধরে তারা যে জান্নাতে “স্বর্গীয় সুখে” থাকবেন, তার হয়তো সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। পৈত্রিকসূত্রে ঈমান লাভ করে “মুসলিম” হিসাবে গণ্য হয়েও, আমরা এই সৌভাগ্যটা চোখে দেখি না কেন? আমরা “ঈমান”-কে সম্পদ মনে করি না কেন?? বর্তমান দুঃসময়ে আমাদের বরং দেখা যায, কাক-পক্ষীর বিষ্টায় নস্ট হয়ে যাওয়া একটা জামা কত তাড়াতাড়ি ছাড়া যায় সে ব্যাপারে যেমন একটা তাড়া থাকে – ঈমান ত্যাগ করার ব্যাপারে এবং পরিপুর্ণ সেক্যুলার হবার ব্যাপারে আমাদের অনেকের অস্থিরতাও অনেকটা তেমনই।

 আসাদ যা দেখে অভিভূত হয়েছিলেন, তার মূলে ছিল ইসলামের collectivism বা সমাজবদ্ধতা – আর আজ আমরা তা ত্যাগ করে বস্তুবাদী অবিশ্বাসীদের individualism বা ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রের পূজায় লিপ্ত হয়েছি। “আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশী তাকে দেব” এমন স্লোগানের মতই “জরায়ূ স্বাধীনতা”র দাবী তুলে “তসলিমা-পন্থীরা” আসলে individualism-এর স্লোগানই দিয়ে থাকেন – অথচ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন মুসলিমের সবকিছুতেই collectivism যেমন স্পষ্ট, তেমনি ইসলামের সকল প্রধান ইবাদতই বলতে গেলে collective: আপনার সালাত collective – জামাতে আদায় করতে হয়, আপনার যাকাতও সামাজিক ব্যাপার, আপনি একা রামাদান পালন করতে পারেন না – ঈদের নামায সকলের সাথে পড়তে হয়, হজ্জ্ব স্পষ্ট একটা collective ব্যাপার, আপনার মৃত্যুতে জানাযা এবং সৎকার তাও collective। অথচ আজকের আমাদের, অধিকাংশ মুসলিমদের, দেখে কি তা বোঝার কোন উপায় আছে? আজ ঢাকার রাস্তায় মাত্র ১০ হাত দূরে একটা ছিনতাই হলেও, “ঝামেলা এড়াতে” কেউ সে দিকে তাকিয়ে দেখতে চায় না – ঢাকার এ্যাপার্টমেন্টগুলোতে থাকা আমরা, নিজের পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটির নামও হয়তো জানি না। যা দেখে একজন ইউরোপীয় ইহুদী কাফির অভিভূত হয়ে মুসলিম হলেন, আমরা আমাদের সেই গুণ হারিয়ে কাফিরদের মত হবার কি প্রাণান্তকর চেষ্টা করে চলেছি!! আল্লাহ্ আমাদের দৃষ্টি যেন খুলে দেন – আমাদের যেন “সত্য ও সুন্দর” দেখার ক্ষমতা দান করেন।

“পূর্বকথা” বা Foreword-এ এর পরপরই মুহাম্মাদ আসাদ বলেন যে, তিনি তখন এটাও অনুধাবন করেন যে, ইসলামের শিক্ষা যে “আদর্শ সম্ভাবনা”-র কথা বলে, বর্তমান মুসলিমদের বাস্তব অবস্থা তার চেয়ে অনেক ভিন্ন এবং তারা সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি অনুধাবন করেন:

 “I realized that the one and only reason for the social and cultural decay of the Muslims consisted in the fact that they had gradually ceased to follow the teachings of Islam in spirit. Islam was still there but it was a body without a soul.” (Page#10, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

 অর্থাৎ: “আমি বুঝলাম যে, মুসলিমদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের একমাত্র কারণ হচ্ছে জীবনের মূলমন্ত্র হিসাবে ইসলামের শিক্ষাকে গ্রহণ করা থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়া। ইসলাম যদিও তখনো ছিল, কিন্তু তা ছিল আত্মাবিহীন একটা কায়ার মত।”

কথাগুলো তখন, ১৯৩৪ সালে বলে থাকলেও, আজো মুসলিম উম্মাহর অবস্থা তার চেয়ে ভালো কিছু নয় – বরং তা আরো খারাপ আকার ধারন করেছে। আসাদ এখানে এবং অন্যত্রও, ইসলাম যে “body and soul”-এর দ্বীন বা “শরীর ও আত্মার” দু’টোরই ধর্ম – এই সত্যটার উপর জোর দিতে চেয়েছেন। একদিকে, ইসলাম বলতে কেউ যেন কেবল কিছু যান্ত্রিক “rituals” বা “নিয়ম কানুন” মেনে চলা বা কিছু নির্দিষ্ট নিয়মে ওঠা-বসা করা না বোঝে – সেটা যেমন গুরুত্বপুর্ণ, তেমনি কেবল মনে মনে ঈশ্বরের প্রতি “গভীর শ্রদ্ধা” ও “ভালোবাসার” দাবী করাকেও কেউ যেন যথেষ্ট মনে না করে – সেটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রথম ধারা হচ্ছে ইহুদীসুলভ “formalism”-এর, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে খৃস্টানসুলভ “laxity”-র – সবকিছু মনে মনে করে, আসলে মনগড়াভাবে সবকিছু করা। একটা জীবন, এই আমাদের জীবনটাই, যেমন “body and soul” বা “দেহ এবং আত্মা” মিলে বাস্তবতা লাভ করে, তেমনি দ্বীন ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী জীবনযাত্রায়, শরীর এবং মনকে যুগপথ আল্লাহর কাছে, আল্লাহর বিধানের কাছে সর্বান্তকরণে সমর্পন করতে হয়। আপনি কি ভাবতে পারেন যে, (শারীরিক নামায, রোজা, দাড়ি রাখা বা পর্দা করা ছাড়া) কেউ বলবে: আমি মনে মনে নামাজ পড়ি, মনে মনে রোজা রাখি, মনে মনে দাড়ি রাখি অথবা মনে মনেই পর্দা করি – “মনের পর্দা আসল পর্দা, বাইরের পর্দা হটাও রে!” সেক্যুলারপন্থী অর্ধ-পুরুষরা তেমন বলতে চাইলেও, আমরা জানি ইসলামে তার কোন স্থান নেই। আবার উল্টোটা দেখুন – সঠিক “নিয়ত” বা intention ছাড়া আপনার নামায হয়ে যেতে পারে কেবলই ওঠা-বসা করা ব্যায়াম, রোজা হতে পারে কেবলই উপোস করা, দাড়ি রাখা হতে পারে পপ-স্টারদের সর্ব-সাম্প্রতিক ফ্যাশন, আর বোরখা হতে পারে কেবলই গোপনে/নিভৃতে লোকচক্ষুর অন্তরালে ব্যভিচার-অন্ত-অভিসারে যাবার একটা মাধ্যম! আজকাল যেমনটা কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে বা বসুন্ধরা সিটির “ফুড-কোর্টে” দেখা যায় – অনেকেই এটাকে “ইসলামী ডেটিং” বলতে চান (নাউযুবিল্লাহ্)। কিন্তু আসলে কি তাই? “ইসলামী ডেটিং” বলে কিছু থাকতে পারে?? না! এখানে বোরখা কেবলই ব্যভিচারের ক্ষেত্র প্রস্তুতের একটা tool।

 বাস্তবে পরিবেশ ও প্রতিবেশে ইসলামের “body and soul” বা “দেহ এবং আত্মা” জীবনযাত্রার proper representation না দেখলেও, আদর্শ ইসলামী জীবনটা কেমন হতে পারে বা হওয়া উচিত, তা তিনি ঠিকই visualize করতে পেরেছিলেন। কি দেখে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন – এধরনের প্রশ্নের উত্তর সম্বন্ধে বলতে গিয়ে, এই অধ্যায়ে তিনি আরো বলেন:

 “It was not any particular teaching that attracted me, but the whole wonderful, inexplicably coherent structure of moral teaching and practical life-program. I could not say, even now, which aspect of it appeals to me more than any other. Islam appears to me like a perfect work of Architecture. All it’s parts are harmoniously conceived to complement and support each other; nothing is superfluous and nothing lacking; and the result is a structure of absolute balance and solid composure.” (Page#11, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

 অর্থাৎ: “ইসলামের কোন একটা নির্দিষ্ট শিক্ষা যে, আমাকে আকৃষ্ট করেছিল এমন নয়; অদ্ভুত সুন্দর, নৈতিক শিক্ষা ও বাস্তব জীবনের কার্যক্রমের অবর্ণনীয় পর্যায়ের সঙ্গত এই কাঠামোর সম্পূর্ণটুকুই আমাকে আকর্ষণ করেছিল। এমন কি এখনো আমি বলতে পারবো না যে, এর কোন দিকটা আমার কাছে অন্যান্য দিকের চেয়ে বেশী আবেদনময় মনে হয়। ইসলামকে আমার স্থাপত্যের একটা নিখুঁত কাজের মত মনে হয় – যেখানে এর সকল অংশই এমনভাবে সমন্বিত যে, প্রতিটি অংশকেই অন্য অংশের পরিপূরক হিসাবে কাজ করার কথা এবং অন্যান্য অংশকে সমর্থন করার কথা চিন্তা করে যত্ন করে স্থাপন করা হয়েছে; এখানে বাড়তি কিছুই নেই অথবা কোন কিছুর অভাবও নেই; যার ফলাফল হচ্ছে নিরঙ্কুশ ভারসাম্য এবং শক্ত গাঁথুনির একটা কাঠামো।”

 সত্যকে কি অদ্ভুত সুন্দর উপায়ে ভলোবাসা ও অনুভব করা – সত্যের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্বের কি দারুণ সুন্দর অভিব্যক্তি ও অনুভূতি!

 অধ্যায়ের শেষে, এই বইখানা ঠিক কি এবং কেন লেখা – তা বলতে গিয়ে তিনি বলেন:

It does not pretend to be a dispassionate survey of affairs; it is the statement of a case, as I see it: the case of Islam versus Western Civilization. And it is not written for those to whom Islam is only one of the many, more or less useful, accessories to social life, but rather for those in whose hearts still lives a spark of the flame which burned in the hearts of the Companions of the Prophet – the flame that once made Islam so great as social order and a cultural achievement. (Page#12, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

 অর্থাৎ: “এখানে (এই বইয়ে) এমনটা ভান করা হয়নি যে, বইখানা হচ্ছে কর্মকান্ডের আবেগহীন একটা জরিপ-কাজ; বরং আমি যেমন বুঝি, এটা হচ্ছে একটা মামলার এজহার: ইসলাম বনাম পশ্চিমা সভ্যতার এটা কেইস (বা মামলা)। আর এই বইটি তাদের জন্য লেখা নয়, যারা ইসলামকে কেবলই সামাজিক জীবনের অনেকগুলো উপকারী অনুষঙ্গিক বিষয়ের একটা মনে করেন, বরং এটা তাদের জন্য লেখা, যাদের অন্তরে সেই আলোক-শিখার রেশ এখনো জীবন্ত রয়ে গেছে, যা কিনা একদিন নবীর (সা.) সাহাবীদের অন্তর আলোকিত করেছিল – যে আলোক-শিখা ইসলামকে এক সময় সামাজিক বিন্যাস ও বিধান এবং সাংস্কৃতিক অর্জনের এক অপূর্ব দৃষ্টান্তের মর্যাদা দিয়েছিল।”

“The Open Road of Islam” হচ্ছে “Islam at the Crossroads” বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের নাম। এই অধ্যায়ের নামটা নিজেই হচ্ছে একটা worldview! ইহুদীরা এবং হিন্দুরাসহ অনেক ধর্মাবলম্বীরাই মনে করে থাকেন যে, কেবল জন্মগতভাবে তাঁদের মাঝে জন্মগ্রহণকারীরাই তাদের ধর্মাবলম্বী হতে পারেন অথবা উল্টোটাও যে, একবার যখন কেউ তাদের ধর্মে জন্মগ্রহণ করেন, তাদের আর অন্য কিছু হবার উপায় নেই – এজন্য RSS বা VHP শ্রেণীর কট্টোরপন্থী হিন্দু মৌলবাদী সংগঠনের একট বিখ্যাত স্লোগান হচ্ছে: “Once a Hindu, is always a Hindu”। অর্থাৎ, একবার যে হিন্দু ছিল, সে সব সময়ের জন্যই হিন্দু – এই যুক্তিতে তারা অনেকদিন আগে ধর্মান্তরিত হওয়া সাঁওতাল বা দলিতদেরও আবার শুদ্ধ করে হিন্দু বানানোর চেষ্টা করে থাকে। ইসলামে ব্যাপরটা সম্পূর্ণই আলাদা। ইসলামের দরজা পৃথিবীর মানচিত্রের যে কারো জন্য সব সময় খোলা – যে কেউ চাইলে ইসলামের “আদর্শভিত্তিক” জাতির একজন সদস্য হয়ে যেতে পারে। আবার, বাবা মুসলিম বলেই কেউ উত্তরাধিকার সূত্রে চিরতরে মুসলিম থাকতে পারে না। প্রাথমিকভাবে, একটা মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করা একজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে “মুসলিম” বলেই জ্ঞান করা হয়! তবে বড় হয়ে সে যদি ইসলামের মৌলিক কোন বিষয় অস্বীকার করে, তবে তাকে একজন “মুরতাদ” বা “কাফির” সাব্যস্ত করা হতে পারে বৈকি।

এই অধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিতে গেলে নীচের কথাগুলো আসে:

 It lies in human nature that, nations and civilizations which are politically and economically more virile exert a strong fascination on the weaker or less active communities, and influence them in the intellectual and social spheres without being influenced themselves. Such is the situation today with regard to the relations between the Western and the Muslim worlds.

 অর্থাৎ: “এটা মানব প্রকৃতির স্বভাবজাত যে, ঐ সব জাতি ও সভ্যতা, যারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশী সক্রিয়/সবল, সেগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও কম সক্রিয় সম্প্রদায়গুলোর আদর্শে ও স্বপ্নে পরিণত হয় এবং নিজেরা কোনভাবে প্রভাবিত না হয়েই দুর্বল জাতিগোষ্ঠীগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক বলয়ের উপর দারুণ রকমের প্রভাব বিস্তার করে। পশ্চিমা বিশ্বের সাথে মুসলিম বিশ্বের পারস্পরিক সম্পর্কের অবস্থাটা আজ সেরকমই।”

 একটা জাতি বা দেশ যখন আরেকটা দেশকে যুদ্ধে পরাজিত করে, সেই দেশটাকে দখল করে নেয়, তখন বিজিতরা সব সময় বিজয়ী জাতিকে সমীহের চোখে দেখে, এমন কি যদিবা সেই সমীহের সাথে ঘৃণা মিশ্রিতও থাকে। আপনি দেখবেন ইংরেজ শাসনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ তৎকালীন ভারতীয় গণসাধারণেরা, সাধারণভাবে ইংরেজদের ঘৃণাই করতো, আর আর তথাকথিত “সুকুমার বৃত্তির” অধিকারীদের তো পরাধীনতার শৃঙ্খলকে স্বভাবতই আরেক ধাপ বেশী ঘৃণা করার কথা। কিন্তু তবু, দেখবেন রবীন্দ্রনাথের মত “মহাপুরুষেরা” সাদা-চামড়া প্রভুদের কি অবলীলায় “তেল” মেরেছেন – জনৈক “সাদাচামড়া প্রভু”র স্তব-স্তুতি করতে গিয়েই নাকি “জনগণমন অধিনায়ক জয় হে, ভারতভাগ্যবিধাতা…” রচনা করেছিলেন তিনি।

 প্রয়াত আলজেরিয়ান স্কলার মালেক বেননাবী, কেন কোন জাতি অন্য আরেকটি জাতির উপনিবেশে পরিণত হয়, তার কারণ খুঁজতে গিয়ে বলেছেন যে, যারা উপনিবেশে পরিণত হয় তাদের চরিত্রে colonizability বলে একটা বিশেষ গুণ থাকে বলেই তারা colonizable বা তাদের উপনিবেশে পরিণত করা যায়। এটা ঠিক যে, (সহজে) colonizable নয়, এমন জাতিগোষ্ঠী খুঁজতে গেলে তাদের বেশীর ভাগই পাওয়া যাবে, “আদর্শগত মুসলিম জাতির” অন্তর্ভুক্ত যে সব ethnic জাতি রয়েছে, সে সবের ভিতর – যাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে আফগান, তুর্কী ও চেচেন জাতিগোষ্ঠী, তবু, মুসলিমদের যে সমস্ত দেশগুলো দীর্ঘদিন উপনিবেশ হিসেবে পশ্চিমাদের পদানত ছিল, সেগুলোর গণসাধারণের মনে ‘প্রভু”দের শ্রেষ্ঠত্ব একরকম মুদ্রিত হয়ে রয়ে গেছে। মুহাম্মাদ আসাদের সুরে সুর মিলিয়ে দু’টো উদাহরণ উল্লেখ করতে চাই: প্রথমটি বেশ ক’বছর আগের কথা। আমার এক বন্ধুর বড় ভাই লিবিয়া গেলেন ইংরেজীর অধ্যাপক হিসেবে। তার এক বন্ধুও একই সময়ে একই যোগ্যতা ও চাকুরী নিয়ে ঐ একই দেশে গেলেন। যাবার সময় আমার বন্ধুর বড় ভাই সরাসরি লিবিয়া গেলেন, আর তার বন্ধু লন্ডন হয়ে গেলেন। লন্ডনে তার ঐ বন্ধু একটা “কেবল attending” course-এ যোগ দেন। ঐ course শেষে তাকে একটা certificate of attendance দেয়া হয়। লিবিয়া পৌঁছে চাকুরীক্ষেত্রে যখন প্রয়োজনীয় সনদ-পত্রাদি জমা দিলেন, তখন কি মনে করে যেন তিনি ঐ certificate of attendanceও জমা দেন। ঐ “রাণীর মাথা” খচিত certificate-এর বদৌলতে তিনি নির্ধারিত বেতনের চেয়ে ১০০ ডলার অধিক বেতনে চাকুরীতে যোগ দেন। এটা লিবিয়ার কোন একান্ত ব্যাপার নয়। যারা সৌদী আরবের চাকুরীর বাজার সম্বন্ধে জানেন, তারা নিশ্চয়ই জেনে থাকবেন যে, একজন পশ্চিমা মানুষ, কেবল তার সাদা-চামড়ার গুণে সেখানে কেমন সমাদৃত হয়ে থাকেন। অথচ, ইসলামের ফরজ/ওয়াজিব পর্যায়ের একটা মূলনীতি হচ্ছে “আল-ওয়ালা ওয়া আল-বারাহ্” – “কে আপনার বন্ধু, সুহৃদ, আপনজন ও নিরাপত্তাদানকারী -আর – কে আপনার শত্রু বা ঘৃণার পাত্র” তার নির্ধারণ! এই নীতিমালার আলোকে এমনিতেই যে কোন মুসলিমের, অপর মুসলিমের কাছে অগ্রাধিকার ও ভালোবাসা পাবার কথা – যা অবিশ্বাসীদের কখনো পাবার কথা নয়। আর একজন মুসলিম ও একজন বিধর্মীর যদি একই যোগ্যতা থাকে, তবে তো কথাই নেই! স্বজাতি সম্বন্ধে হীনমন্যতা ও ঔপনিবেশিক শক্তির অপর সভ্যতাকে উন্নততর মনে করা থেকেই যে এসব বৈষম্যের সূত্রপাত হয় – তা বলাই বাহুল্য। এবার আরেকটি উদাহরণ দেব। আমি একসময় যখন ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করতাম, তখন আমাদের জুনিয়র একটা বাংলাদেশী ছেলেও সেখানে ছিল। ছেলেটি ভালো করে বাংলাও বলতে পারতো না – মুখ খোলার ৩০সেকেন্ডের ভিতই যে কেউ বুঝতে পারতো বাংলাদেশের কোন অঞ্চল থেকে তার আগমণ। ঐ ছেলেটিও যখন দেশে ফিরে এলো, তখন প্রথম দিকে হ্যাট পরতে শুরু করলো । শুধু সে কেন, ৩ মাসের জন্য ইউরোপ আমেরিকা বেড়াতে গিয়েও অনেকে “প্রভু”-দের অনেক অভ্যাস/বদভ্যাস সাথে করে নিয়ে আসেন। বিজিতের বিজয়ীর মত হতে চাওয়া, এক কালের ঔপনিবেশিক “প্রভু”-দের মত হতে চাওয়া বা তাদের মত হতে চাওয়ার স্বপ্ন দেখা ইত্যাদি থেকেই এমনটা ঘটে! অথচ, এদেশে বছরের পর বছর থাকার পরেও ক’জন বৃটিশ বা আমরিকানকে দেখেছেন/শুনেছেন যে, দেশে ফিরে গিয়ে রাতে, ঘরে relax করতে, শোবার আগে লুঙ্গি পরে? অথবা, চিত্ত বিনোদনের জন্য মমতাজের গান শোনে – আমরা যেভাবে ব্রায়ান এডামস বা শাকিরার গান শুনি?! আমি এদেশে কাজ করা এমন বিদেশী সাদা-চামড়া ইউরোপীয়র কথা জানি, যার পানি আসতো ফ্রান্স থেকে – এদেশের পানি সে ছু’তো না!

 আমরা উপরে যা আলোচনা করলাম, আমরা দেখবো যে, Islam at the Crossroads গোটা বই জুড়েই এটা একটা প্রধান theme। হীনমন্যতা থেকে বেরিয়ে আসা, নিজেদের ঐতিহ্যকে জানা, বোঝা এবং তা যে এযাবতকালের পৃথিবীর সকল ঐতিহ্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও কার্যকরী ঐতিহ্য তথা জীবনব্যবস্থা – তা অনুধাবন করার তাগিদ ও অনুপ্রেরণা দেখতে পাওয়া যাবে সারা বই জুড়ে।

মুহাম্মাদ আসাদ আরো বলেন: “We believe that Islam, unlike other religions, is not only a spiritual attitude of mind, adjustable to different cultural settings, but a self-sufficing orbit of culture and a social system of clearly defined features………………….. We have to discover the motive forces of both civilizations – the Islamic and that of the Modern West – and then to investigate how far a cooperation is possible between them.” (Page#15, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

অর্থাৎ:”আমরা বিশ্বাস করি যে, অন্য ধর্মের মত, ইসলাম কেবলই একটা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গী নয়, যা কিনা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশ অনুযায়ী পরিবর্তনশীল – ইসলাম বরং একটা স্বনির্ভর ও পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক ব্যবস্থা।……..আমাদের দু’টো সভ্যতার চালিকাশক্তি সনাক্ত করতে হবে – ইসলামের ও আধুনিক পশ্চিমের – আর তারপর তদন্ত করে দেখতে হবে, উভয়ের ভিতর কতটুকু সহযোগিতা বা আদান-প্রদান সম্ভব।”

 পৃথিবীতে অনেক ধর্ম আছে যেগুলো কেবলই কিছু বিশ্বাস, দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গী – যেগুলো গ্রহণ করতে আপনাকে, বলতে গেলে, জীবনের কিছুই বদলাতে হয় না বা হবে না; বরং পরিবেশ-প্রতিবেশ অনুযায়ী সেগুলোই (ধর্মগুলোই) বদলে যায়। কিছু উদাহরণ দিলে হয়তো ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। আমি একসময় দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক অঙ্গরাজ্যের এক ভদ্রলোকের সাথে প্রায় ৪/৫ মাস চাকুরী করেছি বিদেশী একটি কোম্পানীতে। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন যে, তিনি “লিঙ্গায়েৎ” গোত্রভুক্ত – যারা তাদের মৃতদেহকে পোড়ায় না বরং কবর দেয়। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন যে, মুসলিমদের সাথে দীর্ঘদিন সহাবস্থানের ফলে তারা মৃতদেহ চিতায় পোড়ানোর প্রথাটা ত্যাগ করেছেন। এছাড়াও আমি কর্মজীবনে ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির মানুষজনের সাথে কাজ করেছি – তাদের সাথে মেলামেশা করতে গিয়ে বুঝেছি যে, এক অঞ্চলের পূজা-পার্বণ বা এমন কি দেবতারাও, অন্য অঞ্চলের মানুষদের কাছে অপরিচিত। সুতরাং, আসাদ উপরে যেমন বলেছেন, আমরা দেখছি ধর্ম হিসাবে “হিন্দু spiritual attitude”, বড় একটা দেশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মাঝেই “different cultural settings”-এর সাথে adjust করে নিয়েছে। আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন যে, হলিউডের দু’জন নামকরা তারকা Richard Gere ও Julia Roberts শখের বশবর্তী হয়ে, যথাক্রমে, বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেছেন – কিন্তু এই নতুন ধর্মগুলো গ্রহণ করে তাদের কার্যত কিছুই পরিবর্তন করতে হয় নি – আগে যা করতেন, এখনো তাই করে চলেছেন। অথচ, কারো, ইসলাম গ্রহণ করে কি তেমন করার উপায় আছে? তৎক্ষণাৎ উদাহরণ হিসেবে দু’জন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের কথা মনে পড়লো – Yusuf Islam ও Yvonne Ridley – দু’জনেই বৃটিশ মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করতে গিয়ে বা করে, তাঁদের জীবনে কি আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তা সর্বজনবিদিত! ইসলামের স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা ও মূল্যবোধ রয়েছে। ইসলাম গ্রহণ করে যে কাউকে সেই পরিধির মাঝে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে – তা না হলে বুঝতে হবে যে, তিনি আসলে ইসলাম গ্রহণ করেন নি – বরং কেবল একটা “নাম” গ্রহণ করেছেন!

 তারপর আসাদ বলছেন যে, ইসলামী সভ্যতা ও আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা – এই দু’টোর “চালিকা শক্তিগুলো” কি, তা আমাদের আবিষ্কার করতে হবে; আর তারপর ভেবে দেখতে হবে যে, এই দুই জগতের ভিতর কতটুকু আদান-প্রদান বা সহযোগিতা সম্ভব! আমি অনেক সময় হালাকাগুলোয় বলে থাকি যে, ধরুন আখাউড়া স্টেশনে দু’টো ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে – একটা ঢাকা যাবার অপেক্ষায়, আর অপরটি চট্রগ্রাম যাবার অপেক্ষায়। এই দু’টোর ভিতর কি race সম্ভব?? না, সম্ভব নয়!! কেননা দু’টো ট্রেনের গন্তব্য বা destination সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীত! তারা উভয়ই যদি সর্বোচ্চ গতি সহকারে race বা দৌড় মনোবৃত্তি নিয়ে চলতে শুরু করে, তাহলে কি দাঁড়াবে? একে অপরের কাছ থেকে দূর থেকে আরো দূরে সরে যাবে। ইসলামী সভ্যতা ও আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার গন্তব্য, লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যও তেমনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীত। আমাদের জীবন হচ্ছে আঁখেরাতমুখী – আর ওদের জীবন হচ্ছে দুনিয়ামুখী। আমাদের সকল কর্মে ideally আমরা আখেরাতের কল্যাণ বা মঙ্গল খুঁজবো আর ওরা খুঁজবে কেবলই পার্থিব লাভ!

 এই পর্যায়ে মুহাম্মাদ আসাদ, কুর’আনের ঐ আয়াতটি নিয়ে আলোচনা করেন, যা মানুষের জীবনের purpose বা উদ্দেশ্য বলে দেয় – কেন আল্লাহ্ মানুষকে সৃষ্টি করলেন:

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

“I have only created Jinns and men, that they may serve Me.” (Quran, 51:56)

অর্থাৎ: “আমি জ্বীন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি”

 এরপর তিনি বলেন:

“If the object of our life as a whole is to be the worship of God, we must necessarily regard this life, in the totality of all it’s aspects, as one complex moral responsibility.Thus, all our actions,even the seemingly trivial ones, must be performed as act of worship; i.e. performed consciously as constituting a part of God’s universal plan……..It (Islam) teaches us, firstly, that the permanent worship in all the manifold actions of human life is the very meaning of this life; and, secondly, that the achievement of this purpose remains impossible so long as we divide our lives into two parts the spiritual and the material: they must be bound together, in our consciousness and in our actions into one harmonious entity.” (Page#20, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

 অর্থাৎ:”যদি, আমাদের জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদতই হয়ে থাকে, তাহলে এই জীবনের সবকিছুকে এবং সবদিককে একত্রে একটা একক মৌলিক নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে চিন্তা করতে হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের সকল কর্মকান্ড, এমনকি আপাতদৃষ্টিতে যেগুলোকে একদম সাধারণ মনে হয় সেগুলোও, ইবাদত হিসাবে সম্পন্ন করতে হবে – সচেতনভাবে এই ভেবে সম্পন্ন করতে হবে যে, এগুলো সবই আল্লাহর সার্বিক পরিকল্পনার অংশ।…….. তা (ইসলাম) আমাদের শিক্ষা দেয় যে, প্রথমত, মানব জীবনের বহুমাত্রিক কর্মকান্ডের সকলক্ষেত্রেই স্থায়ী ইবাদতই হচ্ছে জীবনের সত্যিকার অর্থ বা উদ্দেশ্য; দ্বিতীয়ত,(ইসলাম আমাদের এই শিক্ষাও দেয় যে,) আমরা যদি আমাদের জীবনকে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক এই দুইভাগে ভাগ করে নিই, তাহলে এই উদ্দেশ্য সাধন অসম্ভব হবে: বরং জীবনের ঐ দু’টো দিককে আমাদের চিত্তে ও আমাদের কাজে কর্মে একসাথে বেঁধে নিয়ে একটা সমন্বিত চেহারা দিতে হবে।”

 উপরে উদ্ধৃত আয়াতটির অর্থ, গভীরতা ও পরিসর, অনেকেই অনেক সময় fathom করতে ব্যর্থ হন। আমরা যখন বহুল উদ্ধৃত এই আয়াতটি নিয়ে আলাপ করি, তখন অনেকেই একটু থতমত খেয়ে যান – তাহলে কি জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিহার করে কেবল তসবীহ্ জপার মত কিছু করতে বলা হচ্ছে আমাদের! না, ব্যাপারটা সেরকম না। বরং বলা হচ্ছে, জীবনের দৈনন্দিন ও সাধারণ ব্যাপরগুলোতেও আমাদের আল্লাহর সন্তোষ্টির খোঁজ করতে হবে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা হয়তো পরিষ্কার হবে: ধরুন আপনার প্রতিবেশীর সাথে আপনার প্রতিনিয়ত দেখা হচ্ছে – আপনি তাকে হাসিমুখে “হাই-হ্যালো” বলেন, সামাজিক সৌজন্য হিসেবে। এই কাজটা আপনার সামাজিক সম্পর্ককে সতেজ রাখে সত্যি, কিন্তু এটা কোন ইবাদতের কাজ নয়। অথচ, এই ব্যাপারটাই যদি আপনি প্রতিবেশীর প্রতি আচরণের ব্যাপারে আল্লাহ্ বা তাঁর রাসূলের (সা.) নির্দেশের কথা স্মরণ রেখে সমাধা করেন, তাহলে সেটাই ইবাদত হয়ে যাবে; আপনি আপনার ভাইকে ইসলামের রীতি অনুযায়ী “আস সালামু ‘আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু” বললেন – যা একাধারে একটা দোয়া ও ইবাদতের কাজে – আর, রাসূলের(সা.) ভাষ্য অনুযায়ী আপনার মুসলিম ভাইয়ের দিকে হাসিমুখে তাকানোও “সাদাক্বা” অর্থাৎ আবারো, ইবাদতের কাজ। এভাবে যখন জীবনেকে দেখতে শিখবো আমরা, তখন জীবনের প্রতিটি তুচ্ছ বিষয়ই ইবাদতে পরিণত হবে এবং সকল ক্ষেত্রেই আমরা আল্লাহর প্রতি সকৃতজ্ঞ আনুগত্য অনুভব করার ও প্রকাশ করার সুযোগ পাবো। তখনই আমরা বুঝবো টয়লেটে যাওয়া বা টয়লেট থেকে বের হওয়া (উপযুক্ত দোয়াগুলো সহকারে করলে), স্ত্রী সংসর্গ (আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞবোধ সহ, নির্দিষ্ট দোয়া সহকারে, স্ত্রীর হক ইত্যাদির কথা চিন্তা করলে), রাস্তা থেকে একটা কলার খোসা সরানো বা একজন মৃত মানুষের কবর দেয়ার প্রক্রিয়ায় তিন মুষ্টি মাটি ছুঁড়ে দেয়ার মত সকল আপাত সাধারণ কাজও আসলে ইবাদতের কাজ। আমরা বুঝবো: আমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে আল্লাহর ইবাদতের জন্য, আমাদের গোটা জীবনটাই আল্লাহর, এর ছোট বড় সকল কমর্কান্ডই হচ্ছে আমাদের ইবাদতের ক্ষেত্র – আমরা অন্য ধর্মাবলম্বীদের মত কতকটা “ঈশ্বরের” জন্য, আর কতকটা “সরকার বাহাদুরের” জন্য এমন ভাবে জীবনকে ভাগ করতে পারি না – অথবা, কতগুলো কাজ “আধ্যাত্মিক” বলে সেগুলোকে ইবাদতের কাজ মনে করে করলাম, আর উপার্জন বা রাষ্ট্রপরিচালনা ইত্যাদিকে “জাগতিক” কাজ মনে করে সেগুলো যেমন খুশী তেমনভাবে সমাধা করলাম, সেরকমও করতে পারবো না!

 তারপর এই অধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য আরেকটি অংশে মুহাম্মাদ আসাদ বলেন:

“… Islam, which is not a religion of repression, allows to man a very wide margin in his personal and social existence, so that the various qualities, temperaments, and psychological inclinations of different individuals might find there own ways to positive development according to their individual predispositions.” (Page#22, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

অর্থাৎ: “….ইসলাম, যা (মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে) অবদমনের ধর্ম নয়; ব্যক্তিগত ও সামাজিক কমর্কান্ডের বেলায় তা মানুষকে ভিন্নতার একটা প্রশস্ত অবকাশ দিয়ে থাকে – যেন বিভিন্ন গুণাগুণ, সহজাত পছন্দ/অপছন্দ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাভেদে, বিভিন্ন ব্যক্তি মানুষেরা তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী নিজেদের জন্য ইতিবাচক ক্রমবিকাশের পথ খুঁজে পান।”

 এই কথাগুলোকে কারো কাছে, এর আগে আলোচিত ব্যাপারগুলোর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতে পারে – কিন্তু একটু ব্যাখ্যা করলে পরিষ্কার হয়ে যাবে ইনশা’আল্লাহ্। ইসলামে রাসূলের (সা.) কর্মকান্ডগুলোকেও আবার দুইভাগে ভাগ করা হয়: ইবাদত ও ‘আদত বা অভ্যাস (এই বিভাজনকে আমরা যেন আবার “আধ্যাত্মিক” ও “জাগতিক” – এই বিভাজনের সাথে গুলিয়ে না ফেলি)। যেমন ধরুন রাসূল (সা.) আমাদের ডানহাতে খেতে ও পান করতে আদেশ করেছেন – খাওয়াটা যদিও সাধারণ দৈনন্দিন কাজ, তবু এভাবে খাওয়া বা পান করাটা ইবাদতের কাজে পরিণত হয়েছে/হবে এবং এর উল্টোটা, অর্থাৎ, বাঁ হাতে খাওয়া বা পান করাটা গুনাহের কাজ বলে গণ্য হবে – কারণ রাসূল (সা.) বাঁ হাতে খেলে বা পান করলে যে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো, সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন! কিন্তু ধরুন তিনি খেজুর বা বার্লি খেতেন অথবা মরুভূমির উপযোগী বিশেষ কোন পরিধেয় পরতেন – সেসবও কি আমাদের জন্য ইবাদতের বিষয়?? না, তা নয় – ওগুলো বরং ‘আদত বা অভ্যাস। স্থান ও কাল ভেদে পরিবেশ ও প্রতিবেশের variable ব্যাপারগুলোর ব্যাপারে ইসলাম ভিন্নতার অবকাশ দিয়ে থাকে, যদি না সেগুলো ইসলামের বা শরীয়াহর কোন মৌলিক বিধানের বিরুদ্ধে যায়। উদাহরণস্বরূপ একজন ইন্দোনেশীয়ান লুঙ্গী ও কোর্তা পরলো, একজন পাকিস্তানী সালোয়ার/কামিজ পরলো, একজন নরওয়েজিয়ান ওভার কোট পরলো অথবা একজন সৌদী তোব পরলো – আপাতদৃষ্টিতে তারা কত ভিন্ন ভিন্ন চেহারার পোষাক পরলো অথচ তারা সবাই তথাপি ইসলামের dress code-এর আওতাভুক্ত পরিচ্ছদই পরলো। এই বিষয়টাকেই সম্ভবত স্কলাররা Unity through diversity বলে বর্ণনা করে থাকেন। সেজন্যই আপনি দেখবেন মাথার টুপি, হস্তশিল্প বা এমনকি মসজিদের ডিজাইন বা মিনারের আকৃতি ইত্যাদি সবকিছুই গোটা ইসলামী বিশ্ব জুড়ে কত ভিন্ন ভিন্ন রূপে আসে – অথচ, তথাপি, এর সবই মুসলিমদের ঐতিহ্য বলে গণ্য হতে পারে!

এরপর মুহাম্মাদ আসাদ বলেন:

 “….the Islamic teaching contends that man is born pure…It is said in the Holy Qur’an:

 “Verily We create man in the best conformation” – but in the same breath the Qur’an continues:

“… and thereafter We reduce him to the lowest of low – excepting only such as attain to faith and do good works” [Surah 95: 4-6] (Page#23, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

 অর্থাৎ: ” …ইসলামী শিক্ষা আমাদের বলে যে, মানুষ জন্মগতভাবেই ভালো/নিষ্পাপ। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:”আমরা অবশ্যই মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম গঠনে” – কিন্তু একই সাথে কুর’আন বলতে থাকে, “অতঃপর আমরা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছি নীচতমদের নীচে – কেবল তাদেরকে ছাড়া যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে।” (কুর’আন, ৯৫: ৪-৬)

আমরা হয়তো প্রায়ই সবাই জানি যে, ইসলাম বলে: সকল শিশুই আল্লাহ-প্রদত্ত ইসলামের “ফিতরার” উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে, যেমনটা রাসূল(সা.)-এঁর নিম্নলিখিত হাদীসে আমরা দেখতে পাই: “প্রতিটি নবজাত শিশুই ফিতরার (সহজাত স্বাভাবিক প্রবণতা – অর্থাৎ ইসলামী একেশ্বরবাদের) উপর জন্মগ্রহণ করে; তারপর তার পিতা-মাতা তাকে একজন ইহুদী, খৃস্টান বা মাজুসিতে পরিণত করে।” (মুসলিম)। এই ধারণা এই অধ্যায়ের নামকে আরো যথার্থতা প্রদান করে – ইসলামে প্রবেশ করার পথটা হচ্ছে সকলের জন্যই একটা উন্মুক্ত পথ।

উপরে উদ্ধৃত আয়াতগুলো প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ আসাদ বলেন:

In these verses is expressed the doctrine that man is originally good and pure; and furthermore that disbelief in God and lack of good actions may destroy his original perfection. On the other hand, man may retain, or regain that original, individual perfection if he consciously realizes God’s Oneness and submits to His laws.(Page#23, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

 অর্থাৎ: “এই আয়াতগুলোতে যে মতাদর্শ প্রকাশ করা হয়, তা হচ্ছে এই যে, মানুষ আদতে [জন্মগতভাবেই] ভালো এবং পরিশুদ্ধ; কিন্তু তদুপরি আল্লাহয় অবিশ্বাস এবং সৎকর্মবিহীন জীবন, তার সেই আদি পূর্ণতাকে নষ্ট করে দিতে পারে। অন্যভাবে বলা যায়, মানুষ তার সেই আদি ও ব্যক্তিগত পূর্ণতাকে ধরে রাখতে পারে অথবা [হারিয়ে থাকলে] পুনরুদ্ধার করতে পারে, যদি সে সচেতনভাবে আল্লাহর একত্ব বা “তৌহীদ”কে অনুধাবন করতে পারে এবং তাঁর আদেশ-নিষেধের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে।”

 আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে প্রতিটি মানুষই সুন্দর, ভালো, পরিশুদ্ধ এবং পরিপূর্ণ – কিন্তু এর আগে আমরা যেমন বলেছি – আল্লাহ বলেছেন:মানুষকে তিনি সৃষ্টিই করেছেন কেবল তাঁর ইবাদত করার জন্য। এই উদ্দেশ্যটা যখন ব্যর্থ হয়, তখন তার জীবনটা অকেজো ও অর্থহীনতায় পরিণত হয়। সে আর সেরা সৃষ্টি থাকে না বরং lowest of the lowতে পরিণত হয়। ধরুন আপনাকে কেউ একটা BMW গাড়ী দেখাচ্ছে – বলছে এর ট্র্যান্সমিশন পৃথিবীর সর্বাধুনিক, এর সব অপশন রয়েছে – পাওয়ার উইন্ডো, পেছনে ক্যামেরাযুক্ত নেভিগেশন সিস্টেম, চার চাকা ড্রাইভ, খুবই ফলপ্রসু এয়ার কন্ডিশনিং ইত্যাদি ইত্যাদি। সবশেষে বর্ণনাকারী ব্যক্তিটি বললো যে, কেবল একটি সমস্যা – ঐ গাড়ীটি রাস্তায় চলে না বা চলবে না! আপনি কি বলবেন? আগে এত কথা বলা হলো, কত গুণগান গাওয়া হলো, তার সবই অর্থহীন বাক্যব্যয় – কারণ একটা গাড়ী কেনার বা রাখার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, তা রাস্তায় বাহন হিসাবে চলবে। তাই যদি না হয়, তবে ঐ গাড়ীটি অকেজো বা অর্থহীন।

 এর পরপরই আসাদ বলেন:

…Islam ….teaches us,…not to attribute to earthly life that exaggerated value which modern Western civilization attributes to it. While the Christian outlook implies that earthly life is a bad business, the modern West – as distinct from Christianity – adores life in exactly the same way as the glutton adores his food: he devours it but has no respect for it. Islam on the other hand looks upon earthly life with calm and respect. It does not worship it, but regards it as an organic stage on our way to a higher existence……Human life, therefore, is of tremendous value; but we must never forget that, it is a purely instrumental value. In Islam there is no room for the materialistic optimism of the modern West which says: “My kingdom is of this world alone” – nor for the life-contempt of the Christian saying: “My kingdom is not of this world”(Page#26, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

 অর্থাৎ: “ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়: আমরা যেন পার্থিব জীবনকে ঐ ধরনের অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিই, যেমনটা আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা দিয়ে থাকে। পার্থিব জীবনের প্রতি খৃষ্টধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী নেতিবাচক হলেও, তার বিপরীতে আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা পার্থিব জীবনের ‘পূজা’ করে থাকে – যেমনটা কোন খাদক ব্যক্তি তার খাবারের পূজা করে: সে (কোন খাদক) খাবার সাবাড় করে, কিন্তু খাবারের প্রতি তার মনে কোন সম্মানবোধ থাকে না। অপরপক্ষে ইসলাম পার্থিব এই জীবনকে সংযত দৃষ্টিতে ও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। ইসলাম এর পূজা করে না সত্যি, কিন্তু পরবর্তী চিরস্থায়ী জীবনের যাত্রাপথে পার্থিব জীবনকে একটা অপরিহার্য পর্যায় বলে মনে করে। ……..মানব জীবন তাই (ইসলামের দৃষ্টিতে) সাংঘাতিক মূল্যবান; কিন্তু আমরা কখনোই যেন ভুলে না যাই যে এই মূল্যায়ন কেবলই নিমিত্তস্বরূপ (অর্থাৎ পার্থিব জীবনটা আখেরাতের জীবনে সফলভাবে পৌঁছানোর একটা ধাপ/উপায় বা means, কিন্তু নিজেই কোন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য বা end নয়)। ইসলামে ঐ পশ্চিমা বস্তুবাদী আশাবাদের কোন অবকাশ নেই, যার উপর ভিত্তি করে আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা বলে থাকে যে: ‘আমার রাজত্ব হচ্ছে কেবল মাত্র এই পৃথিবীর’ – অথবা একজন সনাতন খৃষ্টানের ঐ জীবন-বিমুখতার অবকাশও ইসলামে নেই, যার ভিত্তিতে সে বলে থাকে:’আমার রাজত্ব এই পৃথিবীর (কিছু) নয়’ ।”

 উপরের কথাগুলোকে সহজে বলতে গেলে আমরা বলতে পারতাম যে, ইসলাম এই পৃথিবীর জীবন থেকে আমাদের যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু “গ্রহণ” করতে বারণ করে না, বরং আখেরাতের জন্য প্রস্তুতির অংশ হিসাবে, আমাদের এই পৃথিবীতেও একটা সুস্থ, সবল, সুন্দর জীবন চাই – কিন্তু ভোগবাদী মনোবৃত্তির বশবর্তী “উপার্জনের জন্য জীবন” না ভেবে, ইসলাম বরং আমাদের “জীবনের প্রয়োজনের জন্য উপার্জন” ভাবতে শেখায়। আমরা তাই রাসূল(সা.)-কে দোয়া করতে দেখি যে, আল্লাহ যেন তাঁকে পর্যাপ্ত (রিযিক) দেন, কিন্তু অতিরিক্ত নয়!

মুহাম্মাদ আসাদ এরপর মুসলিম জীবনের এমন একটা দিক আলোচনা করেন, যা খুব সম্ভবত ইসলামকে সকল ধর্মের চেয়ে পৃথক এবং অদ্বিতীয় একটা অবস্থানে দাঁড় করায়:

The well-known injunction of the Gospels’ “render unto Caesar that which belongs to Caesar, and render unto God that which belongs to God” has no place in the theological structure of Islam, in which firstly, everything is regarded as belonging to God, and secondly, because Islam does not admit of the existence of a conflict between the moral and the socio-economic requirements of our life. In everything there can be only one choice: the choice between Right and Wrong – and nothing in-between. Hence the intense insistence on action as an indispensable element of morality.(Page#27, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

অর্থাৎ: “বাইবেলের (নতুন নিয়মের) নির্দেশনায় বলা হয়: ‘সিজারের (অর্থাৎ সরকারের বা শাসনকর্তার) যা প্রাপ্য তা তাকে দাও, আর ঈশ্বরের যা প্রাপ্য, তা ঈশ্বরকে দাও’। ইসলামের ধর্মতত্ত্বের কাঠামোয় এই ধরনের বক্তব্যের কোন স্থান নেই – যেখানে প্রথমত সব কিছুই আল্লাহর বলে গণ্য করা হয়! দ্বিতীয়ত, ইসলাম যেহেতু আমাদের জীবনের নৈতিক ও আর্থ-সামাজিক দাবীসমূহের মাঝে কোন বিরোধের অস্তিত্ব স্বীকারই করে না। সেহেতু, যে কোন ব্যাপারেই বেছে নেয়ার কেবল একটি মাপকাঠি রয়েছে: শুদ্ধ এবং ভুলের মাঝ থেকে (শুদ্ধকে) বেছে নেয়া – এবং মাঝামাঝি কিছুই নয়! তাই নৈতিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে “আমল” বা বাস্তব কর্মকান্ডের উপর এত জোর দেয়া হয়ে থাকে।”

 লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, দেশ শাসনের ব্যাপারে ইউরোপীয় বা পশ্চিমাদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতা যে সঙ্গত, তার প্রাথমিক ধারণাটা তারা হয়তো বাইবেল থেকেই পেয়ে থাকেন – যেখানে মানুষের জীবনকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে আর সেই সঙ্গে তার অনুগত্যকেও – ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে স্কলাররা হয়তো এটাকে “আনুগত্যে শিরক” বলবেন। ইসলাম মনে করে যে, আনুগত্য কেবলই আল্লাহর প্রাপ্য – আর সকল আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের আওতাধীন হতে হবে। ইসলাম জীবনের সকল ক্ষেত্রকে অতি অবশ্যই আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন মনে করে। তাহাজ্জুদে বা ফজরে ঘুম ওঠা থেকে শুরু করে, রাতে আবার ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত একজন মানুষের জীবনে যত কর্মকান্ড রয়েছে তার প্রতিটির ব্যাপারেই ইসলামের কোন না কোন কিছু বলার আছে বা say আছে। ধরুন ঘুম থেকে উঠে আপনি বসবেন, তখন সুনির্দিষ্ট দোয়া রয়েছে। এরপর টয়লেটে যাবেন – প্রবেশের দোয়া আছে; টয়লেটে কিভাবে প্রবেশ করবেন বা বসবেন সে ব্যাপারে ইসলামের say আছে। ওখানে কি করা যাবে বা যাবে না সে ব্যাপারে ইসলামের দিক-নির্দেশনা আছে। যেমন টয়লেটে বসা অবস্থায় কোন দোয়া পড়বেন না বা সালামের উত্তর দেবেন না। এরপর টয়লেট শেষে বের হবার সময় কি দোয়া পড়বেন এবং কোন পা আগে দিয়ে বের হবেন – তাও ইসলাম আপনাকে বলে দেয়। এভাবে সারাদিনের প্রতিটি ব্যক্তিগত বা দৈনন্দিন কাজও ইসলামের আওতাভুক্ত বা অন্য কথায় বললে, আমরা বলতে পারতাম যে, জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজেও আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার ব্যাপার রয়েছে। একই সাথে, আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতা যেখানে আসবে, সেখানে আর কারো প্রতি আনুগত্যের কোন প্রশ্নই ওঠে না! আনুগত্যের সবচেয়ে বড় দাবিদাররা হচ্ছেন: সাধারণ মুসলিমদের জন্য তাদের খলিফা/আমীর, সন্তানের জন্য বাবা-মা আর স্ত্রীর জন্য স্বামী – কিন্তু এসকল দাবীই বিকল হয়ে যাবে, যখন কেউ এমন কিছু দাবী করবেন, যা আল্লাহর আদেশ-নিষেধের সীমা লঙ্ঘন করবে। এই ব্যাপারটা বর্তমান দুঃসময়ে বহু মুসলিমই বুঝতে অক্ষম – অন্য ধর্মাবলম্বীদের কথা না হয় বাদই দিলাম। এই বিষয়টা বুঝলে, কেউ, একজন বিশ্বাসী মুসলিম হয়ে কিছুতেই আর ধর্মনিপেক্ষতার গুণগান গাইতে পারতেন না!

 এরপর আসাদ বলেন:

Every individual Muslim has to regard himself as to some extent personally responsible for all happenings around him, And to strive for the establishment of Right and the abolition of Wrong at every time and in every direction. A sanction for this attitude is to be found in the Qur’anic verse:

 “You are indeed the best community that has ever been brought forth for [the good of] mankind: you enjoin the doing of what is right and forbid the doing of what is wrong..”(3:110)

This is the moral justification of the aggressive activism of Islam, a justification of the early Islamic conquests and of it’s so called “expansionism”.(Page#28, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

 অর্থাৎ: “প্রতিটি ব্যক্তি মুসলিমের, তার চারপাশে যা ঘটে চলেছে সেসব ব্যাপারে নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা হলেও দায়িত্বশীল মনে করতে হবে। এবং সময়ের যে কোন একটা প্রস্থচ্ছেদে তাকে সবদিক থেকে যা সঠিক সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করার এবং যা অঠিক সেটাকে দূর করার চেষ্টা করতে হবে। কুর’আনের নিম্নলিখিত আয়াতে এই দৃষ্টিভঙ্গীর অনুমোদন দেখতে পাওয়া যায়:

 ‘তোমরা হলে সর্বোত্তম উম্মত, যাদেরকে মানুষের (কল্যণের) জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, …'(কুর’আন, ৩:১১০)

ইসলামের সক্রিয় দাওয়াতী তৎপরতাকে নৈতিকভাবে যথার্থ (বা সঠিক) মনে করার পেছনে এটা হচ্ছে একটা কারণ – আর একারণেই ইসলামের প্রথমযুগের দেশজয় বা তথাকথিত “সম্প্রসারণবাদ”কেও যথার্থ বা ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করা হয়।”

 রাস্তায় চলতে আজ যেমন হয়, ১০ গজ দূরে কাউকে ছিনতাই করা হচ্ছে দেখে একজন পথচারী “ঝামেলা এড়াতে” মুখ ফিরিয়ে নেন – অথবা – একটা মেয়ের প্রতি যখন কোন বখাটে ছেলে একটা অশ্লীল মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়, তখন পাশে চলতে থাকা “প্রথম শ্রেণীর” নাগরিকটি নির্বিকার গবাদি পশুর মত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন – এই ব্যাপরগুলো একটা মুসলিম সমাজে অকল্পনীয় এবং দারুন রকমের “অমুসলিম সুলভ”। কারণ, মুসলিম সমাজের কোন নাগরিকই “যা খুশী তাই করতে পারেন না” – তাকে অবশ্যই মুসলিম সামাজিকতাকে সমীহ করে চলতে হয়/হবে। অপরদিকে, মুসলিম সমাজের প্রতিটি নাগরিকই যেহেতু “সৎকাজে আদেশ ও মন্দকাজে নিষেধ” করাকে ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করেন, সেহেতু, তিনিও জনসম্মুখে একটা অন্যায় ঘটে চলেছে দেখে চুপ করে থাকবেন না! এই সূত্র ধরেই পার্শ্ববর্তী কোন ভূমিতে কোন অনাচার বা অবিচারের সংবাদে বা নিগৃহীত কোন মানুষের আহ্বানে স্বর্ণযুগের মুসলিম সেনাবাহিনী সেই অন্যায়, অবিচার বা জুলুম নির্মূল করতে সমুদ্র পাড়ি দিয়েও সেখানে ছুটে গিয়েছে। এভাবেই একজন অসহায় রমণীর আহ্বানে সাড়া দিতে গিয়ে মুসলিম বালক-সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম তার অজেয় সেনাবাহিনী নিয়ে করাচির অদূরে সিন্ধুর মাটিতে প্রথম পা রেখেছিলেন এবং এক নতুন ইতিহাস ও অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন।

 A mere Platonic discernment between Right and Wrong, without the urge to promote Right and to destroy Wrong, is a gross immorality in itself, for morality lives and dies with the human endeavour to establish its victory upon earth.(Page#28, Islam at the Crossroads – Muhammad Asad)

 অর্থাৎ, “শুদ্ধকে প্রতিষ্ঠা করা এবং ভুলকে ধ্বংস করার বাসনা ছাড়া, ‘শুদ্ধ/ঠিক ও অশুদ্ধ/অঠিক এই দুইয়ের মাঝে কেবল একটা বায়বীয় পার্থক্য নির্ধারণ করেই তৃপ্ত হয়ে যাওয়াটা’ – নিজেই একটা বড় ধরনের অনৈতিকতা, কেননা পৃথিবীতে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে মানুষের সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার উপর নির্ভর করবে নৈতিক মূল্যবোধ টিকে থাকবে কি না!”

 ধর্ম তথা ঈশ্বরে বিশ্বাস হারানো ফরাসী বিপ্লবের হোতারা মনে করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, মানুষ যখন (তাদের সংজ্ঞায়িত আধুনিকতার আলোতে) আলোকিত হবে, তখন পৃথিবীতে এমনি এমনিই কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে – অনেকটা goodness for the sake of goodness হবে ব্যাপারটা। কিন্তু আজ প্রায় ৫০০ বছর পরেও তেমনটি ঘটে নি – কেন? মানুষ এমনি এমনিই তার লোভ, লালসা, কাম, ক্রোধ বা স্বার্থপরতা ত্যাগ করে না। আমরা সবাই জানি যে, সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ঘন্টাখানেক হাঁটা, ব্যায়াম করা বা শরীর সচল রাখার অভ্যাসটা অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। কিন্তু ক’জন তা করি?? আমার তো মনে হয় জনসংখ্যার ১% ও আপনা আপনি তা করি না । কিন্তু মিলিটারী একাডেমী বা মেরিন একাডেমীর মত জায়গায় ১০০% শিক্ষার্থীই রোজ সকালে শারীরিক ব্যায়াম করেন – কেন? কারণ, কাজগুলো করলে “লাভ” এবং না করলে “ক্ষতি”র বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে – তাই তারা ঐ সব কমর্কান্ডের আপাত “কষ্ট”টা স্বীকার করে নেন। একজন বিশ্বাসী মুসলিম যখন বিশ্বাস করেন যে, তাকে “আল্লাহ-নির্ধারিত” একটা “শুদ্ধ” ব্যাপার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতে হবে – অথবা তার সামনে ঘটতে থাকা একটা অন্যায়ের প্রতিকারের চেষ্টা করতে হবে – তা না হলে তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে একটা অন্যায়কে মেনে নিয়ে complacent বা পরিতৃপ্ত থাকলে, তাকে জাহান্নামী হতে হবে, তখন তিনি অবশ্যই “সক্রিয়” হবেন এবং শুদ্ধকে প্রতিষ্ঠা এবং অশুদ্ধকে নির্মূল করতে চাইবেন। তা নাহলে নীতিকথা কেবল বইয়ের পাতায়, কবিতায় আর গানেই থেকে যাবে – “মানুষ মানুষের জন্য” গান গাওয়া সাম্যবাদী ভূপেন হাজারিকারা পরমুহূর্তে উগ্র হিন্দু মৌলবাদী দল বি,জে,পি-র টিকেটে নির্বাচন করবেন অথবা মানুষ গড়ার কারিগর পরিমলরা নিজ ছাত্রীকে ধর্ষণ করতে দ্বিধা বোধ করবে না। সুতরাং, goodness for the sake of goodness-এর মত বায়বীয় কথায় পৃথিবীতে কখনো কোন কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি কখনো হবেও না। দ্বীন ইসলামকে নিজের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে মুসলিমদের ভিতর যে সক্রিয় আকাঙ্খা থাকবার কথা – পরিবর্তনের সেই সক্রিয় আকাঙ্খা ও চেষ্টা থাকা ছাড়া এমনি এমনিতেই কোন কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবার নয়

যা যেনে রাখা প্রয়োজন:

বইখানির নাম: Islam at the Crossroads আর লেখকের নাম: Muhammad Asadআমি বইখানি কিনেছিলাম London-এর Dar al-Taqwa থেকে। তবে আমাদের দেশেও এখন ভারতীয় “পাইরেটেড” প্রিন্ট পাওয়া যায়। আমার কপিটা ১৯৮৭ সালের revised editionআর Muhammad Asad ১৯৯২ সালে মারা গিয়েছেন ৯২ বছর বয়সে! অনেকেই হয়তো জেনে থাকবেন – তবু, যারা জানেন না, তাঁদের অবগতির জন্য: Muhammad Asad ছিলেন অস্ট্রীয়-জার্মান জাতীয়তার একজন ইহুদী (যদিও তাঁর জন্মস্থান এখনকার পোল্যান্ডের অংশ)। ১৯০০ সালে জন্মগ্রহণ করা Leopold Weiss-এর বয়স যখন ২২+, তখন তৎকালীন প্যালেস্টাইনে বেড়াতে এসে তিনি আরবদের ইসলামভিত্তিক জীবনযাত্রার ধরন দেখে অভিভূত হন এবং তারই পথ ধরে অল্প কবছরের মাঝেই (১৯২৬ সালে) ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর ইসলামের হয়ে তিনি অনেক কাজ করেন। তাঁর লেখা The Road to Mecca, Islam at the Crossroads ইত্যাদি বই-পত্রকে যুগান্তকারী বললেও বুঝি কম বলা হবে – ভাবলে অবাক হতে হয় যে, এক সময় তার অনুভব কি দারুণ শুদ্ধ ও খাঁটি ছিল। অথচ, গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকের শুরুতে তিনি যখন তার দ্বিতীয় স্ত্রী – সৌদী নাগরিক মুনিরাকে (যাকে তিনি তার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পরে বিয়ে করেছিলেন) ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং পোলিশ বংশোদ্ভূত পলাকে বিয়ে করেন, তারপর থেকে তার ধ্যান-ধারণা পরিবর্তিত হতে শুরু করে; যার ফলশ্রুতিতে দুঃখজনকভাবে শেষ জীবনে তিনি modernist rationalist এক “নব্য-মুতাযিলা”য় পরিণত হন। Islam at the Crossroads-এর পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা ইসলামের স্বাতন্ত্র, সৌন্দর্য, কার্যকারিতা ও শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য গর্ব তথা পশ্চিমা অবিশ্বাসী সভত্যার antithesis হিসাবে ইসলামকে তুলে ধরা তাঁর কথাগুলো যেন তাঁর শেষ জীবনের পরিণতির দিকে তাকিয়ে – তাঁর অতীত জীবন ও অনুভূতির কথা তাঁকে মনে করিয়ে দিয়ে – নিষ্ঠুর বিদ্রূপের হাসি হাসতে থাকে। সেজন্যই শেষ জীবনে সম্পন্ন করা, তাঁর স্বপ্নের কাজ: The Message of the Qur’an-এর ব্যাপারে, রক্ষণশীলতা তথা শুদ্ধতাকে গুরুত্ব দেয়া স্কলাররা এত সতর্ক! অদ্ভুত সুন্দর অনুবাদ ও ভাষাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও, যার পাতায় পাতায় রয়েছে modernist, rationalist ও মুতাযিলা ভাবধারার অভিব্যক্তি ও ব্যাখ্যা – আর সেজন্যই সৌদী আরবের মত puritan ‘আলেমদের দেশে The Message of the Qur’an-এর প্রবেশ নিষেধ।

Share this nice post:
Profile photo of admin

Written by

Filed under: Islamic Books · Tags:

Leave a Reply

Skip to toolbar