Articles Comments

সরলপথ- الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ » ইসলামী প্রবন্ধ, সমকালীন অপ্রিয় প্রসঙ্গ » ইসলামী worldview

ইসলামী worldview

আমি প্রচলিত ইংরেজী-বাংলা অভিধানে worldview শব্দটির অর্থ খুঁজতে চেষ্টা করেছি কিন্তু পাইনি। হয়তো এই ধারণাটা বাংলা ভাষায় বা সাহিত্যে খুব প্রচলিত নয়। ‘জীবনদর্শন’ শব্দটি হয়তো, worldview শব্দটির খুব কাছাকাছি একটা ভাব প্রকাশ করে। ‘বিশ্বদর্শন’ – মোটামুটিভাবে সমার্থক আরেকটি শব্দ হতে পারতো। মাইক্রোসফ্টের Encarta-র অভিধানে শব্দটির অর্থ বলা হয়েছে: view of all life: a comprehensive interpretation or image of the universe and humanity। সোজা বাংলায় পৃথিবীকে, এই মহাবিশ্বকে, মানবতাকে ও জীবনকে আপনি যে চোখে দেখেন সেটাই হচ্ছে আপনার worldview। ইসলামকে কেবল একটা worldview বলা যাবে না, কারণ, ইসলাম তার চেয়ে আরো অনেক বেশী বিস্তৃত ও ব্যাপ্ত একটা বিষয় – কেবল ধারণা বা দর্শনের ব্যাপার নয়, বরং স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণ এক জীবন ব্যবস্থার নাম ইসলাম – দুনিয়াকেন্দ্রিক হলেও, যে জীবনব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হচ্ছে আখেরাতে ‘সফল’ মানুষ হবার মর্যাদা লাভ করা। ইসলামের জীবনব্যবস্থাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণ মনে করা ঈমানের এক মৌলিক দাবী। ইসলাম, জাহিলী আরবদের, আর সেই সঙ্গে অনাগত কালের সকল মানুষকেও – এক সম্পূর্ণ নতুন worldview উপহার দিয়েছিল, যা নবুয়তের ২৩ বছরে একটু একটু করে বিকশিত হয়ে রাসূল(সা.)-এঁর মৃত্যুর পূর্বেই পূর্ণতা লাভ করেছিল।

জাহিলি আরবরা নারীর সৌন্দর্য বা পূর্ব পুরুষদের মাহাত্ম্য বা নিজেদের বংশের গর্ব ভরা কাহিনী নিয়ে, আরবী ভাষার ঐতিহ্যবাহী সুনিপুণ কারুকাজ ব্যবহার করে কবিতা, কাসিদা বা গান রচনা করতো – অথচ, ইসলামী জীবনব্যবস্থা যখন evolve করছিলো, সেই ২৩ বছরের অধ্যায়ে পর্যায়ক্রমিক ভাবে তাদের বুঝিয়ে দেয়া হলো যে, ঐ সব বন্দনা কেবলই অর্থহীন কিছু প্রলাপ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে সাফল্যের কোন মাপকাঠিও নয়। আরো সহজে বললে, একদিকে ইসলাম বোঝালো যে সকল প্রশংসা কেবল আল্লাহরই – আমাদের যাকে তিনি যে নিয়ামত দিয়েছেন, তা একান্তভাবেই তাঁর করুণাপ্রসূত, এতে আমাদের অহংকার বোধ করার কোন কারণ নেই এবং আল্লাহর সামনে কারো কোন মাহাত্ম্য বা greatness থাকতে পারে না, তেমনি অপরদিকে ইসলাম এও বোঝালো যে, আপনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কবি হয়েও ঈমানবিহীন জীবনযাপন করে যদি মৃত্যুবরণ করেন, তবে আপনার চেয়ে ব্যর্থ ও দুর্ভাগা আর কেউ নেই – কারণ আপনার পরিণতি প্রায় নিশ্চিতভাবেই জাহান্নাম। আবার দেখুন, ইসলামপূর্বক আরবভূমিতে প্রবীণ বা বয়োজ্যেষ্ঠদের এক ধরনের অন্ধ সম্মান দেয়া হতো – ইসলামের worldview বিকশিত হতে হতে বোঝা গেল যে, সাধারণভাবে যেমন সকল মুসলিমকেই সম্মানের চোখে দেখতে হবে, এবং সেই হিসেবে সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠদেরকে বর্জ্য পদার্থ হিসেবে treat করা যাবে না সত্য (যেমনটা পশ্চিমারা করে থাকে) – বরং সদয় ব্যবহার করতে হবে – কিন্তু যে কোন অবস্থায় বয়স ব্যাপারটাই একটা যোগ্যতার মাপকাঠি হবে এমন কোন কথা নেই। সেজন্যই রাসূল(সা.)-এঁর আদেশে হযরত আবু বকর বা ওমর (রা.)-এঁর মত সাহাবীরা, ২০ বছর বয়স্ক সেনাপতি উসামা বিন জায়েদ (রা.)-এর অধীনে সেনা অভিযানে যাবার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন তাঁর মৃত্যুর ঠিক আগে আগে। এরপর আসুন নেতৃত্বের প্রশ্নে – পৃথিবীতে প্রচলিত সাধারণ বিশ্বাস হচ্ছে, পশুকুলের মতই, যার ভিতর ঔদ্ধত্য যত বেশী এবং যে যত বেশী মারমুখী বা aggressive, সে ব্যক্তিই নেতৃত্বের জন্য তত বেশী যোগ্য। ইতিহাসে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ অধিপতিরাই এগিয়ে গেছেন মতা দখল করতে – রোম সাম্রাজ্যের সিজারগণ বা মংগল তস্কর চেংগিজ খান ও হালাকু খান – যে কারো নেতৃত্বের বেলায়ই যোগ্যতার এই মাপকাঠিই প্রযোজ্য ছিল। ইসলামের বিকাশমান worldview এই ধারণাটাই বদলে দিল – রাসূল (সা.) বললেন যে, ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব এগিয়ে এসে যে চাইবে, সে তা পাবার যোগ্য নয় – ব্যস্ as simple as that। আরও বিবেচনা করুন: সম্মানিত কেউ ঘরে ঢুকলে, আমরা যে সমীহভরে ত্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যাই রাসূল (সা.) নিষেধ করলেন সাহাবীদের দাঁড়াতে – ব্যস্, বিলুপ্ত হলো আরেকটি জাহিলী আচার। এভাবে আমি উদাহরণের পর উদাহরণ দিয়ে যেতে পারবো এবং আপনি দেখবেন যে, কিভাবে ২৩ বছর যাবত জীবন ব্যবস্থা হিসেবে, দ্বীন হিসেবে, ইসলাম পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করতে করতে একটা অভূতপূর্ব worldview-এর জন্ম হলো – বলা যায় এক সম্পূর্ণ নতুন worldview আকৃতি ও প্রকৃতি লাভ করলো – অনেকেই যাকে পরবর্তীতে কুর’আনিক worldview হিসেবেও আখ্যায়িত করে থাকেন।

একটা worldview-এর জন্ম হয় একটা belief system-ঘিরে। একটা belief system- এ থাকে একগুচ্ছ বিশ্বাস – যার উপর ভিত্তি করে সেই belief system-এ বিশ্বাসীদের জীবনের ধরন এবং জীবনযাত্রা বাস্তবতা লাভ করে। ইসলামের যেমন রয়েছে সুনির্দিষ্ট একগুচ্ছ বিশ্বাস বা ‘আকীদা – যাকে আমরা দ্বীন ইসলামের belief system পারি – এবং সে সব বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই মুসলিমদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন এবং হ্যাঁ, অতি অবশ্যই এক ইসলামী worldview গড়ে উঠেছিল সপ্তম শতাব্দীর সেই সোনালী যুগে – ঠিক তেমনি কাফির, নাস্তিক বা মূর্তিপূজকদেরও রয়েছে সুনির্দিষ্ট belief system – যার উপর ভিত্তি করে তাদের worldview গঠিত হয়। এদিক থেকে বিচার করলে worldview-কে belief system-এর সরাসরি variable বা function বলা যায় – অর্থাৎ, সহজ কথায়, আপনার worldview কি হবে, তা সরাসরি নির্ভর করবে আপনি কি কি বিশ্বাস করেন তার উপর। আরেকভাবে বলতে গেলে – আপনি সত্যিই কি বিশ্বাস করেন, তার প্রতিফলন ঘটবে আপনার worldview-তে। উদাহরণস্বরূপ আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে, পরকাল সত্যি, শেষ বিচারের দিন সত্যি এবং আখেরাতের অনন্ত কালের তুলনায় পৃথিবীতে আপনার অবস্থান অস্থায়ী ও অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী – তাহলে আপনার সেই বিশ্বাস প্রতিফলিত হবে আপনার worldview-এ। আপনার worldview-তে যে কোন উপায়ে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার কোন কল্পচিত্র থাকবে না। কিন্তু আপনি যদি একজন অবিশ্বাসী কাফির হন – তবে আর যাই হোক, পরকালের ভয়ে আপনি যেমন কোন অন্যায় উপার্জন থেকে বিরত থাকবেন না, তেমনি আপনার বিশ্বাস মতে এই পৃথিবীর ‘এই একমাত্র’ জীবনের ‘ভোগ-সুখের’ পাত্র থেকে আকন্ঠ ও সম্ভাব্য সর্বাধিক পান করতে চেয়ে আপনার সম্পদের চাহিদারও অন্ত থাকবে না। আমার পেশাগত জীবন থেকে আমি আরেকটা সহজ উদাহরণ দিই। আমরা সমুদ্রগামী নাবিকরা যদি মনে করি যে, আমরা জাহাজ নিয়ে যুক্তরাজ্যের উপকূলে যাবো, তাহলে আমরা হাতের কাছে যুক্তরাজ্যের উপকূলের চার্ট* রাখবো – আবার যদি মনে করি যে, আমরা আলাস্কার উপকূলে যাবো তবে নিশ্চয়ই আলাস্কা উপকূলের চার্ট রাখবো! কিন্তু এমন যদি হয় যে, আমি আলাস্কা উপকূলের চার্ট সংগ্রহ করেছি, অথচ মুখে বলছি যে, আমি আসলে যুক্তরাজ্যে যেতে চাই – তাহলে ব্যাপারটা কি অসঙ্গত মনে হবে তাই না? এখানে যেমন আপনি যে গন্তব্যে যেতে চাইবেন সেই গন্তব্যেরই চার্ট যোগাড় করাটাই সুস্থ মস্তিষ্কের পরিচায়ক, জীবনের বেলায়ও আপনার belief system অনুযায়ীই আপনার worldview হবে সেটাই স্বাভাবিক – তা না হলে বুঝতে হবে কোথাও মারাত্মক কোন সমস্যা রয়েছে।

এই রচনার প্রস্তাবনায় আমরা তাহলে বলতে চাইছি যে, (জনমিতির তথ্য অনুযায়ী) পৃথিবীর ১৩০ কোটিরও বেশী মুসলিমের অত্যন্ত ক্ষুদ্র যে অংশটি আমরা আজ ইসলামের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখি, তারা যদি মনে করি যে, ইসলামী belief system বা আকীদাহর সাথে পশ্চিমা তথা বস্তুবাদী কাফিরদের worldview গ্রহণযোগ্য বা compatible, তাহলে আমাদের স্বপ্ন-সাধও উপর্যুক্ত উদাহরণের মতই হাস্যকর ও অসঙ্গত বলতে হবে। এখানেই ইসলামের পুনর্জাগরণকামী অনেক বিশ্বমানের চিন্তাবিদদের চিন্তা শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়েছে। জলজ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে আমরা এখানে কয়েকজন চিন্তাবিদের চিন্তার করুণ পরিণতির উদাহরণ উপস্থাপন করবো – যাদের প্রত্যেকের চিন্তার বিশ্বস্ততা বা ইখলাস নিয়ে আমার অন্তত ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোন সন্দেহ বা সংশয় নেই।

প্রথমে ধরা যাক মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাবের কথা – পুনর্জাগরণের প্রচেষ্টার নিরিখে, তিনি যে ইসলামের ইতিহাসের একজন বিশাল ব্যক্তিত্ব, তা নিয়ে তাঁর শত্রুদেরও কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরীরা – বিশেষত রাজ-ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বর্তমান সৌদী রাজের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদ – হঠাৎ পাওয়া ঐশ্বর্যের উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে ভোগ-বিলাসে গা ভাসিয়ে দিয়ে পশ্চিমা তথা বস্তুবাদী অবিশ্বাসীদের worldview-কে যেভাবে আত্তীকরণ করলেন এবং তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে (ফয়সলের সীমিত ব্যতিক্রম ছাড়া) বাকী যুবরাজরা সেই ধারাকে যেভাবে অব্যাহত রাখলেন, তাতে মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাবের স্বপ্নের পুনর্জাগরণের প্রচেষ্টা যে বর্জ্য পদার্থের মত একপ্রকার নর্দমায় প্রবাহিত হয়ে বিলীন হয়ে গেলো – তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আজ তাই ইসলামের শত্রুদের কাছে তো বটেই, মুসলিম বিশ্বেও ‘ওয়াহাবী’ কথাটা একটা গালমন্দের মত ব্যবহৃত হয় – অথচ, মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব, কোন নতুন ‘ইজমের’ জন্ম দিতে চান নি। তিনি কেবলই চেয়েছিলেন ইসলামকে শিরক ও বিদ’আতের আবর্জনা মুক্ত করে নবী(সা.)-এঁর প্রদর্শিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে। আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদ কি করতে পারতেন আর কি করলেন, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে তার পুত্রপ্রতিম, ইহুদী থেকে ধর্মান্তরিত, অস্ট্রীয়-জার্মান মুহাম্মদ আসাদ বলেছেন, His unprecedented rise to power at a time when most of the Middle East had succumbed to Western penetration filled the Arab world with the hope that here at least was the leader who would lift the entire Arab nation out of its bondage; ….. establishing a state in which the spirit of the Koran would reign supreme. But these hopes remained unfulfilled. As his power increased ….. it became evident that Ibn Saud was no more than a king – a king aiming no higher than so many other autocratic Eastern rulers before him.
……………….. Ibn Saud has, nevertheless, not displayed the breadth of vision and inspired leadership which was expected of him.
……….he indulges and allows those around him to indulge in the most extravagant and senseless luxuries.*

এরপর আসুন মিসরের আল-ইখওয়ানুল আল-মুসলিমুনের প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল বান্না এবং ঐ একই প্রতিষ্ঠানের চিন্তাবিদ সৈয়দ কুতুবের কথায়। ইসলামের belief system-এর সাথে কেবল ইসলামের worldview সংযোজিত হলেই যে ইসলামের পুনর্জাগরণ সম্ভব, এ কথাটা তাঁদের কাছে স্ফটিক-স্বচ্ছ ছিল (যদিও তাদের আক্বীদাহ বা মানহাজ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে)। কিন্তু তাঁদের উত্তরসূরীরা নানা কারণে তাঁদের দিক নির্দেশনা হারিয়ে ফেললেন – ইসলামী belief system-এর সাথে পশ্চিমা worldview-এর সংযোজন ঘটলো – দলের একাংশ তিজারাহ্পন্থী হয়ে নানা রকম ‘ইসলামী ব্যবসায়’ জড়িত হলেন, ভাবলেন ব্যবসার মুনাফা দিয়ে, সেবা দিয়ে এবং আস্থাভাজন হয়ে, জনগণের কাছে যাবেন তারা – সেই সঙ্গে পশ্চিমা worldview-এর গণতন্ত্রের প্রতিও ঝুঁকে পড়লেন তাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। দল তাদের আদি সংগ্রামী চরিত্র হারালো। ফলে তাদের দলও দিক নির্দেশনা হারিয়ে নানা ভাগে ও নানা মতে বিভক্ত হয়ে পড়লো। তাদের কর্মকান্ডের স্থবিরতায় অসন্তুষ্ট হয়ে সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সদস্যরা গঠন করলেন “ইসলামী জিহাদ”, “আল্ গামা আল্ ইসলামীয়াহ্” এবং “তাকফির ওয়া হিজরার” মত চরমপন্থী সংগঠনগুলো – মূল অংশ টিকে রইলো গৃহপালিত ও অরাজনৈতিক একটি বিরোধীদল হিসেবে। নানা নামের আড়ালে যদিও নির্বাচন ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করেছেন তারা – কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বজ্রমুষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচারের একটি – মিসরীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের গদি তাতে টলানো যায়নি। গোটা মধ্যপ্রাচ্যে আজ যেখানে ইসলামী যত দল রয়েছে, তাদের সাথে কোন না কোন ভাবে আল-ইখওয়ানুল আল-মুসলিমুনের একটা যোগসূত্র যেমন খুঁজে পাওয়া যাবে – তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী intelligentsia-র অনেকেই আদতে আল-ইখওয়ানুল আল-মুসলিমুনের দীক্ষায় দীক্ষিত। প্রয়াত মুহাম্মদ আল গাজ্জালী ও বর্তমানে কাতারে বসবাসরত ইউসুফ আল্ কারযাভী – জন্মগতভাবে মিসরীয় এই দুই ব্যক্তিত্ব, আর বৃটেনে নির্বাসিত তিউনিশিয়ার ইসলামপন্থী নেতা রশীদ ঘানুসি হচ্ছেন এমন তিন ব্যক্তিত্ব। সময়ের সাথে এদের সবার চিন্তা-চেতনার বিবর্তন ঘটেছে, এরা সবাই আল-ইখওয়ানুল আল-মুসলিমুনের প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন-সাধ থেকে সরে এসেছেন এবং পরিণত বয়সে এরা অনুভব করেছেন যে, ইসলামী belief system-এর সাথে পশ্চিমা worldview চলতে পারে। আধুনিক বিশ্বের নিয়ন্তা রাষ্ট্রসমূহ, অন্য অনেক কিছুর সাথে তাদের worldview-এর যে বিশ্বায়ন করতে চাইছে, তার ভয়াবহতা এঁরা কতটুকু আঁচ করেছেন আল্লাহু ‘আলাম। প্রয়াত মুহাম্মদ আল্ গাজ্জালী যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সভ্যতাকে, পৃথিবীর ইতিহাসে এযাবত কালের সবচেয়ে অগ্রগামী এবং শ্রেষ্ঠ সভ্যতা বলে বর্ণনা করেছেন । মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের প্রতিবাদে সোচ্চার পৃথিবীর এক নম্বর ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদ বলে পরিচিত ও সম্মানিত ইউসুফ আল্ কারযাভী – গণতন্ত্রসহ বেশকিছু বিতর্কিত বিষয়ে নতুন ধারার মন্তব্য করে হালে নিজেকে আধুনিকতাবাদী বলে পরিচিত করেছেন। অপর আলোচ্য ব্যক্তিত্ব রশীদ ঘানুসি, পশ্চিমের প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ ব্যক্ত করে সোজা-সাপটা ভাষায় বলেছেন যে তিনি একজন ‘democratic Muslim’ – এছাড়া তিনি আরেকটি বক্তৃতায় বলেছেন যে, তিনি ‘আমেরিকান ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করতে চান** । সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, উপরে বর্ণিত তিনজন ইসলামী ব্যক্তিত্বেরও আসলে ইসলামের আকীদার সাথে পশ্চিমা worldview-কে গ্রহণ করতে তেমন সমস্যা নেই – এরা সবাই মনে করেন যে, আমাদের অর্থাৎ মুসলিমদের, পশ্চিমা সভ্যতা এবং worldview থেকে গ্রহণ করার মত অনেক কিছু রয়েছে। অথচ, একটু ভাবলেই যে কেউ বুঝবেন যে, পশ্চিমা worldview তথা সভ্যতা নির্ভেজাল কুফরের উপর প্রতিষ্ঠিত – যে সভ্যতার স্থপতিরা হয় মনে করেছেন যে, আল্লাহ্ বলতে আসলে কেউ নেই – নতুবা মনে করেছেন আল্লাহর এখন আর কোন প্রয়োজন নেই, আল্লাহর মৃত্যু ঘটেছে (যেমন নি্টশে বলেছেন – নাউজুবিল্লাহ্); নতুবা মনে করেছেন যে, কেউ আল্লাহ্ সম্বন্ধে কি ভাববে না ভাববে তা নিতান্তই তার ব্যাক্তিগত ব্যাপার – দৈনন্দিন পার্থিব জীবনে আল্লাহর কোন ভূমিকা নেই: আপনি উপাসনা করতে চান খুব ভালো, ব্যক্তিগত পর্যায়ে আপনি যত খুশি উপাসনা করুন – কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কোন কর্মকান্ডে আল্লাহর আদেশ/নিষেধের প্রসঙ্গ উল্লেখের কোন অবকাশ নেই।

এবার আসুন ইসলামের পুনর্জাগরণের প্রচেষ্টায় নিবেদিত প্রাণ, গত শতাব্দীর অপর অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব মৌলানা মৌদুদীর প্রসঙ্গে (যদিও তাঁরও আক্বীদাহ বা মানহাজ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে)। ব্যতিক্রমী প্রজ্ঞার অধিকারী এই ব্যক্তিত্ব বুঝেছিলেন যে, ইসলামী belief system-এর সাথে বিজাতীয় worldview চলতে পারে না। এই বিষয় থেকে উদ্ভূত পার্থক্যকে ঘিরে একদিকে অখন্ড-হিন্দুস্থানপন্থী ট্র্যাডিশনাল ‘আলেমদের সাথে তার যেমন মতবিরোধ দেখা দেয়, তেমনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই তিনি যখন বুঝলেন যে, পাকিস্তান আসলে ইসলামী belief system বা worldview-এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত কোন রাষ্ট্র নয় বরং, তা মূলত পশ্চিমা worldview-এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এক মুসলিম প্রধান ‘ন্যাশন স্টেট’ – তখনি তিনি পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর উত্তরসূরীরা সে অবস্থান থেকে আজ অনেকটা সরে এসে, হয় – তারা মনে করছেন যে, ইসলামী আক্বীদার সাথে পশ্চিমা worldview-কে খাপ খাওয়াতে না পারলে, ইসলাম তথা তাদের নিজেদের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে এবং একথা বিশ্বাস করে হয় তারা নিজেদের আধুনিকায়নে যত্নশীল হয়েছেন – না হয় – ইসলামী belief system-এর সাথে যে পশ্চিমা বা কুফফারের worldview কিছুতেই ‘মিশ’ খাবার নয়, এ ব্যাপারটা নিয়ে তাদের চিন্তা করারই অবকাশ হয়নি। অর্ধ শতাব্দীরও বেশী সময় ধরে একটু একটু করে অত্যন্ত নিবেদিত প্রাণ কর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও তাগুতপন্থীদের হাতে তাদের নির্যাতন-নিপীড়নের বিনিময়ে, আমাদের দেশে একমাত্র উল্লেখযোগ্য ইসলামী সংগঠন হিসেবে তারা যে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন – আজ তাদের বিভ্রান্ত ও হত-বিহ্বল, সঠিক দিকনির্দেশনাবিহীন দলীয় কর্মকান্ড দেখে মনে হয় যে, তাদেরও সম্ভবত পশ্চিম-অনুকরণের westoxification বা occidentosis*** রোগে ধরেছে এবং আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া তাদের আন্দোলন প্রায় চোরাবালিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, গত শতাব্দীতে এই উপমহাদেশে, সত্যিকার অর্থে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করা বলতে কি বোঝায়, তার মানসচিত্র এবং তা করার জন্য প্রয়োজনীয় ইখলাস প্রাথমিক ভাবে দলগত পর্যায়ে একমাত্র তাদেরই ছিল। আজ তারা সেই লক্ষ্য হারিয়েছেন। অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে – সাধারণভাবে জ্ঞান বিমুখতা, দূরদর্শিতাসম্পন্ন চিন্তাশীল ও গতিশীল নেতৃত্বের অভাব, সাধারণের মাঝে (যেমন বস্তিবাসী মানুষের মাঝে) কাজ করার অপারগতা বা অনীহা, স্বাধীনতার মত প্রায় সর্বজনপ্রিয় ইস্যুতে ভুল পক্ষে অবস্থান (যদিও খুব সম্ভবত তারা তাদের বিশ্বাসের ব্যাপারে বিশ্বস্ত ছিলেন এবং আমরা এখন যেমন জানি যে, হিন্দুস্থানীরা অনেক আগে থেকেই, সেই ১৯৫০-এর দশক থেকেই, ‘পাকিস্তান’ নামক দেশটিকে ভাঙ্গার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল – তারা হয়তো তখন তা আমাদের বোঝার অনেক আগেই আঁচ করেছিলেন) ও তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার: পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মজলুমের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হওয়া, (পরবর্তীতে ব্যবসায় বা) তিজারায় সাফল্য হেতু দলে তিজারাহ্পন্থী ও বিলাসিতাকামী মনোভাবের বিস্তৃতি এবং সর্বোপরি আধুনিকতাবাদীদের হাতে দলের steering চলে যাওয়া – এগুলোই হচ্ছে সম্ভবত স্বাধীনতার পর থেকে নিয়ে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হবার প্রধান কারণসমূহ। তাদের দলের বর্তমান অবস্থা হিজবুত তাহরীর, জামাতুল মুসলিমিন বা হিজবুত তৌহিদের-এর মত নতুন নতুন গোষ্ঠীর উত্থানের পথ সুগম করে দেয় – ফলে দেশের শতধাবিভক্ত ইসলামপন্থীরা আরো বিভক্ত হলেন। উপরে উল্লিখিত নতুন গোষ্ঠীগুলোর কারো কারো অধিকাংশ কর্মী ও সমর্থকই মূলত জামাত/শিবির থেকে দলছূট এবং জামাতের কর্মকান্ডে হতাশ তথা পরিবর্তনকামী ইসলামপন্থী। দ্বীন শিক্ষায় শিক্ষিত ‘আলেমদের মুখে বাংলায় খুতবা শোনার জন্য, আমি তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, ঢাকার কাঁটাবন মসজিদে (কয়েক বছর আগে পর্যন্তও) জুম্মার নামাজ পড়তাম। সেখানকার খতিবদের আগুন-ঝরা খুতবার সাথে তাদের দলের কর্মকান্ডের অসঙ্গতি, স্পষ্টতই দলের মাঝে স্ববিরোধিতার আভাস দিত।

এবার আসুন আমাদের দৈনন্দিন ও বাস্তব জীবনে worldview কিভাবে প্রভাব বিস্তার করে, আর কি কারণে মুসলিমদের জন্য বিজাতীয় worldview অনিষ্টকর তা নিয়ে আরো কিছু আলাপ করা যাক। একটা প্রশ্ন আসতে পারে যে, কতটুকু বা কত ক্ষুদ্র একটা ব্যাপারকে আমরা worldview-এর আওতায় গণ্য করবো। এরকম একটা প্রশ্নের উত্তরে বলতে হবে যে, দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ‘ঐচ্ছিক’ বিষয়ই এই worldview-এর আওতায় পড়বে। উদাহরণ স্বরূপ আপনাকে বেঁচে থাকার জন্য মূত্রত্যাগ করতে হবে – এখানে আপনার ইচ্ছার স্বাধীনতা নেই – এটা নিতান্তই একটা জৈবিক ব্যাপার, সুতরাং এই কর্মটি worldview-এর আওতায় আসে না। কিন্তু আপনি কি ভাবে মূত্রত্যাগ করবেন সে ব্যাপারে আপনার ইচ্ছার স্বাধীনতা যেহেতু রয়েছে – সেহেতু সে বিষয়ে আপনার worldview কি তা ধর্তব্যের ভিতর এসে যাবে। আপনার যদি একটা ইসলামী worldview থাকে, তবে আপনি বসে মূত্রত্যাগ করার চেষ্টা করবেন এবং আপনার পানির প্রয়োজন হবে – সুতরাং আপনার মত ইসলামী worldview সম্পন্ন মানুষদের পরিবেশ ও প্রতিবেশের টয়লেটগুলোতে সে সবের ব্যবস্থা থাকবে স্বাভাবিক ভাবেই। যে দেশের অধিকাংশের একটা কাফির worldview থাকবে, সে দেশের টয়লেটগুলোতে, খুব স্বাভাবিকভাবেই, বসে মূত্রত্যাগ করার যেমন কোন ব্যবস্থা থাকবে না, তেমনি থাকবে না এমনকি শৌচকর্মের জন্যও পানির কোন ব্যবস্থা । যারা ইংল্যান্ড বা আমেরিকার মত কোন পশ্চিমা কুফফারের দেশে গেছেন, তারা আমার কথার সত্যতা অনুধাবন করতে পারবেন। তদুপরি লজ্জা/হায়া/শরমের বিষয়টাও এসে যাবে আনুষঙ্গিকভাবে। পশ্চিমা দেশের পাবলিক টয়লেটগুলোতে পুরুষদের জন্য যেভাবে দাঁড়িয়ে মূত্রত্যাগের ব্যবস্থা থাকে, তাতে যে কারো চোখে ঐ কর্মরত অবস্থায় অন্যের লিঙ্গ দৃশ্যমান হতে পারে। আমার পেশা জীবনের এক ছোট ভাই, ১৯৯০-র দশকে পেশাগত লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে যান পরিবার সমেত। হিথরো এয়ারপোর্টে তার ৮/৯ বছর বয়স্ক ছেলেটি টয়লেটে যেতে চাইলে তিনি তাকে পুরুষদের টয়লেটে নিয়ে যান। সেখান থেকে বেরিয়ে ‘সভ্য’ জগত সম্বন্ধে ছেলের প্রথম প্রশ্ন ছিল, “আব্বু, সবার ‘টুনুমণি’ দেখা যায় কেন?” – তাহলে দেখুন worldview-এর ব্যবধানটা কত ছোট ব্যাপারেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এরপর আসুন আরেকটি অত্যন্ত সাধারণ ‘চোখ-এড়িয়ে-যাওয়া’ বিষয়ে। ক’দিন আগে দেশের ইসলামপন্থী একটি গবেষণা সংস্থায় আমাকে তারা ডেকেছিলেন পরিচিত হতে। যোহরের নামাজের সময় হলে, আমি তাদের সাথে জামাতে যোহরের সালাত আদায় করি। জামাতে সালাতের ব্যাপারে তাদের পদ্ধতির শুদ্ধতা আমাকে অবাক করে দেয়। আকন্ঠ বিদ’আতে ডুবে থেকে নিশ্চিন্ত চিত্তে ধর্মকর্ম করে যাওয়া পৃথিবীর ৩য় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বলে পরিচিত হতভাগ্য আমাদের এই দেশে, কোথাও যে এত শুদ্ধ পদ্ধতিতে নামাজ পড়া হয়, তা আমার জানা ছিল না। তবে একটা জিনিস খেয়াল করে আমার খানিকটা খটকা লাগলো – ঐ সংস্থার বেশ গুরুত্বপূর্ণ এক কর্মী টাইট ব্লু জিন্সের ভিতরে সার্ট ঢুকানো অবস্থায় সালাত আদায় করলেন। নারী ও পুরুষের শরীর ভেদে, ইসলামে সুনির্দিষ্ট ঢেকে রাখার অংশ রয়েছে, যাকে আমরা ইসলামী পরিভাষায় ‘সতরুল আওরাত’ বা সংক্ষেপে ‘সতর’ বলি। এই ‘সতর’ শুধু ঢাকলেই হবে না, তা যেন প্রস্ফুটিত না হয় বা তার আকার ও আকৃতি যেন ফুটে না ওঠে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আজ থেকে ২৫/৩০ বছর আগে থেকেই বাংলাদেশী চলচ্চিত্রে তথাকথিত ‘সর্প নৃত্যের’ নামে, সারা গায়ে সেঁটে থাকা কালো একখানা ‘নাম-না-জানা’ পরিধেয়র আবরণে ঢেকে নারীদেহকে যেভাবে প্রতিটি ভাঁজ প্রস্ফুটিত করে দর্শকদের জন্য উপস্থাপন করা হতো, তা যে সতর ঢেকে রাখা নয়, একথাটা সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন যে কোন মানুষই বোধকরি বুঝবেন । ১৯৮০-র দশকের গোড়ার দিকে, আমি যখন প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে যাই, তখন খেয়াল করতাম সেখানকার দামী ব্র্যান্ড নামের জিন্সগুলোর অধিকাংশই ছিল ‘স্ট্রেচ্-জিন্স’। যিনি পরবেন তার গায়ে প্রথমে প্যান্টগুলো অস্বস্তিকর ভাবে টাইট হবে – তারপর সেগুলো ‘স্ট্রেচ্ড’ হয়ে শরীরের আকার আকৃতি ধারণ করে আপনার গায়ের সাথে সেঁটে থাকবে। এধরনের জিন্স পরিধানকারীর সংখ্যা মেয়েদের ভিতর বেশী হলেও, অনেক ছেলেদেরও দেখেছি সে সব ব্যবহার করতে। ঐ ধরনের জিন্স অথবা সাধারণভাবে সকল জিন্স পরার আসল উদ্দেশ্য যে লজ্জা নিবারণ নয় বরং হাঁটা চলায় নিতম্ব সহ নিম্নাংগের প্রতিটি অংশের নড়াচড়া তথা আকার/আকৃতি জাহির করা – তা সচেতন ভাবে বুঝতে শুরু করেছি আরও অনেক পরে। শরীর পূজা ও নানা ভাবে শরীর প্রদর্শন ও বিক্রী করা কাফির সভ্যতা – যাদের রয়েছে কাফির belief system এবং কাফির worldview – তাদের জন্য ব্যাপারটা কোন সমস্যার না হলেও, ইসলামী belief system-এর সাথে ব্যাপারটা যে খাপ খায় না, তা অন্ধ ছাড়া সকলেরই দেখার, বোঝার ও জানার কথা। এধরনের পরিচ্ছদ পরে আমরা যখন সালাতের সেজদায় যাবো, তখন অবস্থা আরো করুণ হবার কথা – এবং আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান মতে নামাজ না হবারই কথা (আমি ভুল বলে থাকলে, পাঠক, দয়া করে আমাকে শুধরে দেবেন ইনশাল্লাহ্)। তাহলে আমরা এই সমস্যাগুলো দেখতে অক্ষম কেন? আমার এই জীবনে, আমি কোন খুতবায়, কোন হুজুরকে তো বলতে শুনিনি যে, এরকম পোষাক পরে নামাজ শুদ্ধ হবে না – কোন বাবাকে শুনিনি তার ছেলেকে এভাবে বোঝাতে যে, কেন কোন পরিধেয় আমরা গ্রহণ অথবা বর্জন করবো!

 

একই ভাবে চিন্তা করে দেখবেন, আমাদের দেশে প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকিং হচ্ছে ইসলামী belief system-এর সাথে কুফফারের worldview-কে সংযোজিত করার একটা হাস্যকর ও করুণ প্রচেষ্টা। এমনিতে হয়তো আক্ষরিক অর্থে সুদের কারবার তারা করছেন না সত্যি – কিন্তু ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় গণসাধারণের যে কল্যাণ এবং সুযোগ-সুবিধা বা সম্পদের যে পুনর্বন্টন হবার কথা, তা নিয়ে কেউ ভাবিত বা চিন্তিত বলে তো মনে হয় না। বাংলাদেশের একটি ইসলামী ব্যংক, কেবল একটি শিল্প পরিবারকে ২০০০ কোটি টাকারও বেশী অর্থ-সহায়তা দিয়েছে – যা দিয়ে ঐ সংস্থাটি বাংলাদেশকে হিন্দুস্থানী যানবাহনের একচেটিয়া বাজারে পরিণত করেছে। তাহলে এই ব্যাংকিং-এর দর্শনের সাথে চেজ ম্যানহাটন বা আরভিং ট্রাস্টের তফাৎ রইলো কোথায়? আগে পাকিস্তানের বিত্তশালী ২২ পরিবারের চিন্তায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানীদের ঘুম হতো না – এখন দেশে কোটিপতির সংখ্যা কত? এহেন ইসলামী ব্যাংকিং কি ধনী এবং দরিদ্রের মাঝে ব্যবধান কমিয়েছে, না কি কুফফার শ্রেষ্ঠ যুক্তরাষ্ট্রের আদলে, এমন সব বিশাল কর্পোরেট সংস্থা বা conglomerate-এর জন্ম দিতে সাহায্য করছে, যারা ইতোমধ্যেই দেশ বা জাতিকে চোখ রাঙ্গানোর মত ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে (এই তো কিছুদিন আগে, পূর্ববর্তী একটি সরকারের দুর্নীতির অংশীদার এক শিল্পপতি, বাংলাদেশকে বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপের ভয় দেখিয়ে সীমাহীন ধৃষ্টতার পরিচয় দিলেন)। দ্বিতীয়ত ঐ ব্যাংকের “ইসলামী মুরুব্বীরা” যখন গুজরাটে মুসলিম হত্যাযজ্ঞের পরে হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন, সেটারই বা কি অর্থ রইলো – সেটাতো, যে কোন যুক্তিতে, কূম্ভিরাশ্রু বলেই মনে হবার কথা। না কি তারাও, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর তাগুত শাসকরা যেভাবে লোক দেখাতে, ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে থাকেন, সেভাবেই তাদের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের দেখাতে হিন্দুস্থানে মুসলিম হত্যার বিরুদ্ধে ‘প্রতিবাদ জ্ঞাপন’ ‘প্রতিবাদ জ্ঞাপন’ খেলা খেলে থাকেন – অথচ, মনে মনে ভাবেন যে, হিন্দুস্থানের সাথে সুসম্পর্ক না থাকলে তো তাদের ‘তিজারাহ্’ মাঠে মারা যাবে??

এই পর্বে বলার জন্য আমার আরো কিছু কথা মনে আসছে – আপনি ভেবে দেখুন অন্য সব বাদ দিলেও, এমনকি উপাসনার ক্ষেত্রেও কিভাবে আমাদের worldview বদলে গেছে এবং যাচ্ছে। আমাদের দ্বীন আমাদের কাছে সমষ্টিগত সামাজিকতা (collectivism) দাবী করে – সুতরাং, জীবনের অন্য সব কিছুর মতই আমাদের উপাসনাতেও collectivism প্রতিফলিত হবার কথা – যেমন জামাতে মসজিদে নামাজ আদায় করার ব্যাপারে হয়ে থাকে। কিন্তু এখানেও পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে এবং ইসলামী belief system-এর সাথে কুফফারের worldview এসে মিশেছে। দেশের প্রায় আড়াই লক্ষ মসজিদের মাঝে, হয়তো হাতে গোণা ২৫টির মত মসজিদে জামাতে দাঁড়ানোর সময়, পায়ে পা লাগিয়ে এবং কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে ফাঁক বন্ধ করে দাঁড়ানো হয় – যেমনটা রাসূল(সা.) আমাদের দাঁড়াতে বলেছেন এবং যা নিশ্চিত করা ইমামের দায়িত্ব ও কর্তব্য। বাকী মসজিদগুলোতে পাশাপাশি দাঁড়ানো দুইজন মুসল্লির মাঝে ৬ ইঞ্চি থেকে ১ ফুটের মাঝে বিভিন্ন মাপের ফাঁক দেখতে পাবেন আপনি – যা আমাদের হৃদয়ের অমিলের পরিচায়ক । আপনি যদি সেই ব্যবধান কমিয়ে আনতে কারো গা ঘেঁষে দাঁড়ান, তবে তিনি যে আপনার দিকে বিরক্তি ভরে তাকাবেন তা ৯৫% ক্ষেত্রে নিশ্চিত! উপরন্তু, আমরা অনেকেই একখানা জায়নামাজ নিয়ে যখন মসজিদে যাই, সেই জায়নামাজে অন্য কেউ দাঁড়ানোটা অনেক ক্ষেত্রেই আমরা পছন্দ করি না – বিশেষত তা যদি দামী কোন উৎসের হয়। আমাদের worldview-এ যেমন collectivism থাকার কথা, কুফফারের worldview-এ তেমন individualism বা ‘যার-যার-তার-তার’ মানসিকতা রয়েছে। অথচ, আজ আমদের belief system-এর সাথে কুফফারের worldview মিশে গেছে। আমরা নামাজে আলগা আলগা ভাবে দাঁড়াতে পছন্দ করি – আমরা মসজিদে কুশল বিনিময় করি না – অন্য কোন মুসলিম ভাইয়ের সমস্যা সমষ্টিগতভাবে সমাধানের কোন চেষ্টা করি না । সবাই ‘যার-যার-তার-তার’ মত ‘একা একা’ ‘জামাতে’ নামাজ আদায় করে ঘরে ফিরি!!

কি জানি আমাদের দেশে ইসলামের ধারক, বাহক বা অভিভাবক যারা – যারা নিজেদের ইসলামপন্থী বলতে পছন্দ করেন – তারা হয়তো পথ চেয়ে আছেন ইমাম মাহদীর আগমনের জন্য, যখন তিনি এসে তাদের বর্তমান দুরবস্থা থেকে উদ্ধার করবেন – অথবা – তারা হয়তো মনে করেন যে, ইসলামী worldview আজ আর চলবার কথা নয়। আমরা ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের উপর বক্তৃতা করে মুখে ফেনা তুলে ঘরে ফিরে যখন ‘ফ্রেন্ডস’ বা ‘বিগ ব্রাদার শো’ দেখতে অথবা হিন্দুস্থানী রূপ ব্যবসায়ের সর্ব সাম্প্রতিক সংযোজন দেখতে আমাদের টিভি ‘অন’ করবো, তখন যেন একবার ভেবে দেখি যে, আমার ঐ বক্তৃতায় আসলে আমি নিজেই বিশ্বাস করি কিনা। এভাবে জীবনের ছোট বড় সব ঐচ্ছিক সিদ্ধান্তের বেলায় ভাবতে হবে যে, আমার ইচ্ছাটায় কি ইসলামী worldview প্রতিফলিত হলো, না কাফির worldview প্রতিফলিত হলো।

ইসলামী ‘আকীদা বা belief system-এর আওতাভুক্ত যে সব বিশ্বাস রয়েছে, তার কোন একটিতে আস্থা না থাকলে আমরা কাউকে পরিপূর্ণ মুসলিম বা মু’মিন বলতে পারবো না – বরং তাদের আদৌ মুসলিম বলা যায় কিনা তা নিয়ে মুফতিদের মতামত জিজ্ঞেস করতে হবে। এছাড়া আমরা আবারো স্মরণ করতে চাই যে, ইসলামের জীবনব্যবস্থাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণ মনে করা ঈমানের একটা মৌলিক দাবী । উদাহরণ স্বরূপ আপনি যদি ‘মনে করেন’ যে, আল্লাহর আইন বা শরীয়াহর বিধি-বিধানের ৯৯% এখনো প্রযোজ্য, কিন্তু ১% এখন আর প্রযোজ্য নয় বরং তার পরিবর্তে বৃটিশ আইন, সুইস্ আইন বা অন্য যে কোন ‘কাফির আইন’ শ্রেয় – তাহলে আপনি টেকনিক্যালি ইসলামের সীমানার বাইরে চলে গেলেন। এখানে ‘মনে করেন’ শব্দ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ – কারণ আমরা সবাই আজ তাগুতের প্রচলিত আইনের অধীনে ‘নাগরিক’ এবং সে আইন মেনে চলতে আমরা অনেক ক্ষেত্রে একপ্রকার ‘বাধ্য’। কিন্তু বাধ্য-বাধকতার এই দুর্দশার মাঝেও, আমাদের হৃদয়ে এই বিশ্বাস অবশ্যই থাকতে হবে যে, আল্লাহর আইনই মুসলিমদের জন্য একমাত্র গ্রহণযোগ্য আইন এবং মানুষকে শাসন করার অধিকার রয়েছে একমাত্র আল্লাহর। মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব বা মানুষের মনগড়া শাসন কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটুকু থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, ইসলামী belief system সংকোচন, সম্প্রসারণ, পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করার কোন অবকাশ নেই – যারাই এই belief system-কে বিকৃত করার চেষ্টা করবেন, তারা সেই বিকৃত ‘আকীদা নিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবেন – যেমনটা বেরিয়ে গেছেন বাহাইরা বা কাদিয়ানীরা।

আমাদের বুঝতে হবে যে, রাসূল(সা.)-এঁর মৃত্যুর আগেই যেহেতু ইসলামী belief system-এর উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা worldview পরিপূর্ণ রূপ লাভ করেছে, সেহেতু আজ তা আর নতুন ভাবে নাযিল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। আমরা অনেকেই যেমন নিজ দায়িত্ব পালন না করে ইমাম মাহদীর আগমনের অপেক্ষায় বসে আছি এই ভেবে যে, তিনি এসে আমাদের ত্রাণ করবেন, তেমনি যদি আমরা ইসলামী worldview-এর অপেক্ষায়ও বসে থাকি, তবে তা আমাদের কাছে কোনদিনও আসবে না – বরং আমাদেরই নিজেদের টেনে নিয়ে যেতে হবে সেই worldview-এর কাছে। কু্ফর যেমন ইসলামের anti-thesis, তেমনি পশ্চিমা worldview হচ্ছে, ইসলামী worldview-এর anti-thesis। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ ঘোষণায় প্রথমে যেমন বাকী সব উপাস্যকে অস্বীকার করে তবে আল্লাহকে উপাস্য বলে ঘোষণা দেয়া হয়, তেমনি আমরা যদি ইসলামের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখি, তবে বাকী সকল worldview-কে জীবন থেকে বের করে, তবে আমাদের মানসে ইসলামী worldview প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা না হলে, ৭ম শতাব্দীর সোনালী যুগের পর থেকে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার বহু ভ্রান্ত প্রচেষ্টার মতই, আমাদের সকল প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়বে।

আমার বক্তব্য প্রায় শেষ। আমি আপনাদের অনেক দুঃসংবাদ দিলাম – অনেক প্রচ্ছন্ন দুঃস্বপ্ন সম্বন্ধে অবহিত করলাম। টুপি ও দাড়ির মুখোশের আড়ালে, আমাদের সত্যিকার চেহারা কি তা দেখিয়ে দিতে, আমি হয়তো অনেকের জন্য mirror বা আয়না হিসেবেও কাজ করলাম। কিন্তু একটা ব্যাপারে নিশ্চিত থাকবেন, আমার সব প্রচেষ্টা হচ্ছে as an insider – (সারা বিশ্বের বা) আমাদের দেশের কুফফার বা তাদের চামচা নাস্তিক/মুরতাদ চক্র যখন মুসলিমদের উপর – বিশেষত পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট মুসলিম ও মু’মিনদের উপর চড়াও হয় – তখন আমি পুলকিত বোধ করি না। তাদের – অর্থাৎ নিজেদের যারা মুসলিম ও মু’মিন ভাবতে ভালোবাসেন, আমার সে সব ভাইদের – কষ্টে আমার হৃদয়ে তাদের জন্য রক্তরণ হয়। অথচ, তাদের কথায়, কাজে বা কর্মে যখন স্ববিরোধিতা দেখি, তখন আমার ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে তাদের ঘোর কাটিয়ে দিই – তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিই: পৃথিবীর যে life-style তারা আকাঙ্খা করছেন এবং অবলম্বন করতে চাইছেন, সেই পথ ধরে কোন দিনই – তারা যে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কথা বলে বেড়ান – সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন না। আসলে একটা belief system-এর উপর ভিত্তি করেই যদি worldview গঠিত হয় – অথবা, “যেমন ‘আকীদা (বা belief system) তেমন worldview”, এই কথাটা যদি সত্যি হয়, তবে বর্তমানে আমাদের ‘আকীদার অবস্থা কি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি আশাবাদী, তাই, ‘যে কারো কর্মই তার ঈমানের নির্ণায়ক বা সূচক’ – এই সূত্রটা অনুযায়ী আমাদের ঈমানী স্ট্যাটাস যা হবার কথা, সেটা আমি উচ্চারণ করলাম না। বরং এই পর্যায়ে নিজেকে এবং অন্য সকল মুসলিম পরিচয়ধারী ইসলামপন্থীকে মু’মিন বলেই ধরে নিলাম – ধরে নিলাম যে, আমাদের অবস্থা আসলে ‘হাল-ভেঙ্গে-দিশা-হারানো-নাবিক’ বলতে যা বোঝায় তেমন। আমরা জানি আমাদের গন্তব্য কি, তবু একটা দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আমরা দিশা হারিয়েছি – প্রাণপণ চেষ্টায় সেই ভাঙ্গা হাল মেরামত করতে পারলে, আমরা হয়তো আবার আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর আশা করতে পারি। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানমতে সেই মেরামত কর্মের পদক্ষেপগুলি কি হতে পারে, আসুন আপনাদেরকে তা বলি:

১) আমরা যখন বাজারের লিস্ট তৈরী করি, তখন চাল ও মাছের মত গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোকে প্রথমে লিখি, আর নীচের দিকে অনেক কষ্টে মনে করে করে ধনিয়ার পাতা বা মেথির মত কম গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোর নাম লিখি। আমাদের জীবনের লিস্টে বর্তমানে আল্লাহ্ যদি নীচের দিকে থেকে থাকেন(নাউযুবিল্লাহ্), তবে আসুন তাঁকে আমরা ১ নম্বরে নিয়ে আসি – আমাদের জীবনে তাঁকে সব কিছুর উপরে স্থান দিই – সবচেয়ে বেশী priority দিই। আমরা, আমাদেরকে সৃষ্টি করার একমাত্র উদ্দেশ্যটা মনে রাখতে চেষ্টা করি – যেমনটা আল্লাহ্ আমাদের কুর’আনে মনে করিয়ে দিয়েছেন:

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“জ্বিন ও মানুষকে আমি শুধু এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার দাসত্ব করবে।”
(কুরআন, সূরা আয যারিয়াত, ৫১:৫৬)

২) আমাদের যাদের জীবন, এ যাবত অর্থের পেছনে অর্থহীন ছুটোছুটিতে কেটে গিয়েছে – সেই জীবনকে আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করতে চেয়ে, সুসংহত করার লক্ষ্যে, দ্বীন শিক্ষার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আসুন, আমরা ভাষা হিসেবে কুর’আনিক আরবী শিখতে চেষ্টা করি। সত্যিই যদি আল্লাহকে আমরা ১ নম্বর priority দিয়ে থাকি, তবে অতি অবশ্যই আমরা তাঁর কথা মনে করে এ কাজের জন্য সময় বের করতে পারবো ইনশা’আল্লাহ্!

৩)আমাদের প্রতিটি সন্তানকে, তাদের জীবনের প্রারম্ভে, আমরা ভাষা হিসেবে কুর’আনিক (বা ক্লাসিক্যাল) আরবী শিক্ষা দিতে চেষ্টা করবো ইনশা’আল্লাহ্। আমরা যে কুর’আন বুঝি না, এটা তাগুত ও কুফফারের কাছে অত্যন্ত স্বস্তির একটা বিষয়* । আজ তাই তাগুত শাসিত পৃথিবীর সব মুসলিম মানচিত্রের রেডিও ও টিভিতে কুর’আন তেলাওয়াত হয় নির্দ্বিধায় – এমনকি ইসরাইলের জাতীয় রেডিও থেকেও নাকি কুর’আন তেলাওয়াত সম্প্রচারিত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আজকালকার আরবদের সিংহভাগই কুর’আনের ভাষা বোঝেন না – তারা ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক dialect-এ কথা বলেন। কোন জনগোষ্ঠীকে তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার সবচেয়ে প্রাথমিক, কার্যকর ও দ্রততম উপায় হচ্ছে তাকে তার “ভাষা” থেকে বিচ্ছিন্ন করা। আমরা যদি কুর’আনিক worldview-তে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তবে সর্বাগ্রে কুর’আনিক আরবীকে আমাদের জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। টাকার জন্য কুফফারের দাসত্ব করতে বা ‘সিলিকন ভ্যালীতে’ একটা চাকুরী করতে যাবার যোগ্যতা অর্জন করতে, আমরা যদি ‘চোস্ত’ ইংরেজী শিখতে পারি – তবে সত্যিকার অর্থে এই বিশ্ব-চরাচরের একমাত্র প্রভু আল্লাহর কিতাব বোঝার জন্য, আমরা নিশ্চয়ই মাতৃভাষার পাশাপাশি ২য় ভাষা হিসেবে আরবী শিখতে পারবো ইনশাল্লাহ্!

৪)আমাদের বর্তমান দুরবস্থার ভয়াবহতা অনুধাবন করলেও, আজ আমরা অনেকেই তা থেকে বেরিয়ে আসার কোন পথ পাচ্ছি না। এই দিশেহারা অবস্থার মূল কারণ হচ্ছে: আমাদের দেশে, বিশুদ্ধ দ্বীনের শিক্ষা দান করার মত শিক্ষক নেই বললেই চলে(থাকলেও আমি হয়তো জানি না) – বরং, নববর্ষের বেহায়াপনা থেকে শুরু করে, হিন্দুস্থানী মূর্তির [Indian idol কথাটার আক্ষরিক অর্থ তাই দাঁড়ায়। আমাদের কি করুণ অবস্থা – পূজা করার মত নিজ দেশীয় মূর্তিও নেই!!(নাউযুবিল্লাহ্)। ] প্রদর্শনী – এসব কিছুকেই জায়েজ করে দেবার মত, বা নিদেন পক্ষে ‘চলছে তো চলুক’ বলে দেখেও না দেখার ভান করে চুপ থাকার মত ‘হজুর’ রয়েছেন অগণিত। তাই, বিশেষত, আমাদের শিশু সন্তানদের স্বচ্ছ ও আনকোরা মগজ এদের হাতে তুলে দেয়া যে বিপজ্জনক – তা হয়তো ‘ইখলাস’ সম্পন্ন সকল বাবা-মাই বুঝবেন। আমরা তাহলে কি করতে পারি? প্রথমে, শিক্ষক তৈরী করার লক্ষ্য সামনে রেখে – পারিবারিক পর্যায়ে যারা সচ্ছল, তারা তাদের উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের সন্তানদের মাঝে, মেধার দিক দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ যারা – তাদের সৌদী আরব, ইয়েমেন বা সিরিয়ায় দ্বীন শিক্ষার জন্য পাঠাতে পারেন – তা না হলে অন্তত এদেশেও যে ২/১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে Islamic Studies and D`awah-র মত স্নাতক(সম্মান) কোর্সের ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানেও তাদের পাঠানো যেতে পারে। এধরনের একটা প্রচেষ্টা সামাজিক পর্যায়ে সংঘবদ্ধভাবে গ্রহণ করলে, সব দিক থেকেই তা অনেক সহজ হতে পারে। ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো এককভাবে বা অন্যদের সাথে মিলে মিশে মেধাবী ছেলেদের একটা ‘পুল’ তৈরী করতে পারেন (ধারণাটা আমি একটি মুখ্য ইসলামপন্থী সংগঠনের মুরুব্বিদের কাছে অনেক আগেই পেশ করেছিলাম – কিন্তু তারা তার কোন গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন বলে মনে হয় না)। তারা এই সব ছেলেদের সংসারের অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব থেকে তাদের অব্যাহতি দেবার অঙ্গীকার করবেন – এবং এরা দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ফিরে এসে নির্দলীয় ও খাঁটি দ্বীন শিক্ষার প্রতিষ্ঠানে, শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের ছেলে-মেয়েদের আরবী ভাষা সহ দ্বীন শিক্ষা দেবে – সুন্দর, ইসলামের জন্য অনুকূল ও সব মুসলিমের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশে। ইনশাল্লাহ্ ভাষাসহ দুটো প্রজন্মও যদি দ্বীন শিখতে পারে তবে – কুফফারের ষড়যন্ত্রে দ্বীন ও দুনিয়ার শিক্ষাকে আলাদা করার পর এবং আরবী ভাষা থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করার পর, গত প্রায় আড়াইশো বছরে যে অগ্রগতি হয়নি – ২০ বছরেই তা হওয়া সম্ভব। তার মানে এই নয় যে, আমরা আমাদের সন্তানদের সকলকে ইসলামজীবী ‘মোল্লা-মৌলবী’ বানাতে চাইছি। আমাদের প্রাথমিক টার্গেট হবে, কারিকুলাম বদলানোর অবস্থানে যাবার আগ পর্যন্ত, প্রাথমিক স্কুল লেভেলের ছেলে-মেয়েদের মগজে শক্তভাবে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান প্রোথিত করে, তবে তাদের মাধ্যমিক স্কুলে পাঠানো। মাধ্যমিক স্কুলগুলো যেন কিশোর কিশোরীদের, কুফফারের worldview থেকে মুক্ত একটা পরিবেশ দিতে পারে – সে দিকে বিশেষ সতর্ক মনোযোগ দিতে হবে। বলাবাহুল্য যে, যে সব পিতা-মাতা তাদের সন্তানকে ‘ইসলামী belief system-এর সাথে ইসলামী worldview সমেত’ পূর্ণ মুসলিম ও মু’মিন হিসেবে গড়ে তুলতে চান – তারা নিশ্চয়ই যে সব স্কুলে কুফফারের অনুকরণে Halloween, New year’s day বা father’s day-র মত কুফরি কালচার থেকে আগত অনুষ্ঠানাদি পালিত হয় – সে সব স্কুলে তাদের পড়তে পাঠাবেন না!? ঐ ধরনের পরিত্যাজ্য স্কুলের তালিকায় বলতে গেলে সকল ইংরেজী মিডিয়াম স্কুলই এসে যাবে।

-০-

Footnote*:
এক কালের বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী গ্ল্যাডস্টোন নাকি পার্লামেন্টে বলেছিলেন: “As long as the Quran exists, Europe will never be able to conquer the Islamic East.” । আলজেরিয়ায় নিয়োজিত জনৈক ফরাসী ঔপনিবেশিক গভর্নর, সেখানে ফরাসী উপনিবেশের শতবর্ষপুর্তি উপলে প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন: It is a must to remove the Arabic Quran and to remove the Arabic language from their tongues in order for us to have victory over them. দেখুন:page#47, How to Approach and Understand the Quran – Jamaal al-Din M. Zarabozo.

Share this nice post:
Profile photo of sajiblobon

Written by

Filed under: ইসলামী প্রবন্ধ, সমকালীন অপ্রিয় প্রসঙ্গ

Leave a Reply

Skip to toolbar