Articles Comments

সরলপথ- الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ » আক্বীদা / ঈমান, তাওহীদ / শীরক » আল্লাহ কোথায়?

আল্লাহ কোথায়?

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআতের সকল ইমামের অন্যতম আকীদা হচ্ছে মহান আল্লাহ আরশে আযীমে সমুন্নত। সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহীনগণ এই আকীদাই পোষণ করতেন। কুরআনের সাতটি স্থানে আল্লাহ তাআ’লা উল্লেখ করেছেন যে তিনি আরশে আযীমের উপর সমুন্নত।

(১) আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

إِنَّ رَبَّكُمْ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ

“নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি আকাশ-যমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন। (সূরা আ’রাফঃ ৫৪)

(২) আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

إِنَّ رَبَّكُمْ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ

“নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি আকাশ-যমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন”। (সূরা ইউনূসঃ ৩)

(৩) আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ

“আল্লাহই ঊর্ধŸদেশে আকাশমন্ডলী স্থাপন করেছেন বিনা স্তম্ভে। তোমরা এটা দেখছো। অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন”। (সূরা রা’দঃ ২)

(৪) আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى

“দয়াময় আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন”। (সূরা তোহাঃ ৫)

(৫) আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَانُ

“অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন”। তিনি পরম দয়াময়। (সূরা ফুরকানঃ ৫৯)

(৬) আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ

“আল্লাহই আকাশ-যমিন এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সকল বস্তু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন”। (সূরা সাজদাহঃ ৫৪)

৭) আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

هُوَ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ

“আল্লাহই আকাশ-যমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন। (সূরা হাদীদঃ ৪)

উপরোক্ত প্রত্যেক স্থানেই (استوى على العرش) “ইসতাওয়া আলাল আরশি” বাক্যটি ব্যবহার করেছেন। আমরা যদি আরবী ভাষায় ইসতিওয়া শব্দটি অনুসন্ধান করতে যাই তবে দেখতে পাই যে, (استوى) শব্দটি সব সময় (على) অব্যয়ের মাধ্যমে ব্যবহার হয়ে থাকে। আর (استوى) শব্দটি এ ভাবে ব্যবহার হলে ‘সমুন্নত হওয়া’ এবং ‘উপরে হওয়া’ ব্যতীত অন্য কোন অর্থে ব্যবহার হয় না। সুতরাং الرَّحْمَنُ عَلَىْ العَرْشِ اسْتَوَى এবং এর মত অন্যান্য আয়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ সৃষ্টি জগতের উপরে সমুন্নত হওয়া ছাড়াও আরশের উপরে বিশেষ একভাবে সমুন্নত। প্রকৃতভাবেই আল্লাহ আরশের উপরে। আল্লাহর জন্য যেমনভাবে সমুন্নত হওয়া প্রযোজ্য, তিনি সেভাবেই আরশের উপরে সমুন্নত। আল্লাহর আরশের উপরে হওয়া এবং মানুষের খাট-পালংক, সিংহাসন, যানবাহন ও নৌকায় আরোহনের সাথে কোন সামঞ্জস্যতা নেই। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ الْفُلْكِ وَالْأَنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ لِتَسْتَوُوا عَلَى ظُهُورِهِ ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ وَتَقُولُوا سُبْحانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ

“তিনি তোমাদের আরোহনের জন্য সৃষ্টি করেন নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তু যাতে তোমরা তার উপর আরোহণ করতে পার, তারপর তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তোমরা ওর উপর স্থির হয়ে বস এবং বলঃ পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এদেরকে আমাদের জন্য বশীভূত করেছেন, যদিও আমরা সমর্থ ছিলাম না এদেরকে বশীভূত করতে। আর আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করবো।” (সূরা যুখরুফঃ ১২-১৪) সুতরাং মানুষের কোন জিনিষের উপরে উঠা কোন ক্রমেই আল্লাহর আরশের উপরে হওয়ার সদৃশ হতে পারে না। কেননা আল্লাহর মত কোন কিছু নেই।

যে ব্যক্তি বলে যে, আরশের উপরে আল্লাহর সমুন্নত হওয়ার অর্থ আরশের অধিকারী হয়ে যাওয়া, সে প্রকাশ্য ভুলের মাঝে রয়েছে। কেননা এটা আল্লাহর কালামকে আপন স্থান থেকে পরির্বতন করার শামিল এবং ছাহাবী এবং তাবেয়ীদের ইজমার সম্পূর্ণ বিরোধী। এ ধরণের কথা এমন কিছু বাতিল বিষয়কে আবশ্যক করে, যা কোন মুমিনের মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়া সংগত নয়। কুরআন মাজীদ আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ

إِنَّا جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ

“আমি এই কুরআনকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।” (সূরা যুখরুফঃ ৩) আরবী ভাষায় ইসতাওয়া শব্দের অর্থ ‘সমুন্নত হওয়া’ এবং ‘স্থির হওয়া’। আর এটাই হল ইসতিওয়া শব্দের আসল অর্থ। সুতরাং আল্লাহর বড়ত্বের শানে আরশের উপর যেভাবে বিরাজমান হওয়া প্রযোজ্য, সেভাবেই তিনি বিরাজমান। যদি ইসতিওয়ার (সমুন্নত হওয়ার) অর্থ ইসতিওলা (অধিকারী) হওয়ার মাধ্যমে করা হয়, তবে তা হবে আল্লাহর কালামকে পরিবর্তন করার শামিল। আর যে ব্যক্তি এরূপ করল, সে কুরআনের ভাষা যে অর্থের উপর প্রমাণ বহণ করে, তা অস্বীকার করল এবং অন্য একটি বাতিল অর্থ সাব্যস্ত করল।

তাছাড়া “ইসতিওয়া” এর যে অর্থ আমরা বর্ণনা করলাম, তার উপর সালাফে সালেহীন ঐকমত্য (ইজমা) পোষণ করেছেন। কারণ উক্ত অর্থের বিপরীত অর্থ তাদের থেকে বর্ণিত হয়নি। কুরআন এবং সুন্নাতে যদি এমন কোন শব্দ আসে এবং সালাফে সালেহীন থেকে সে শব্দের প্রকাশ্য অর্থ বিরোধী কোন তাফসীর বর্ণিত না পাওয়া যায়, তবে সে ক্ষেত্রে মূলনীতি হল উক্ত শব্দকে তার প্রকাশ্য অর্থের উপর অবশিষ্ট রাখতে হবে এবং তার মর্মার্থের উপর ঈমান রাখতে হবে।

যদি প্রশ্ন করা হয় যে, সালাফে সালেহীন থেকে কি এমন কোন কথা বর্ণিত হয়েছে যা প্রমাণ করে যে, “ইসতাওয়া” অর্থ আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন? উত্তরে আমরা বলব হ্যাঁ, অবশ্যই তা বর্ণিত হয়েছে। যদি একথা ধরে নেয়া হয় যে, তাঁদের থেকে এর প্রকাশ্য তাফসীর বর্ণিত হয়নি, তবেও এ সমস্ত ক্ষেত্রে সালাফে সালেহীনের নীতি হল, কুরআন এবং সুন্নাহর শব্দ যে অর্থ নির্দেশ করবে, আরবী ভাষার দাবী অনুযায়ী শব্দের সে অর্থই গ্রহণ করতে হবে।

ইসতিওয়ার অর্থ ইসতিওলা দ্বারা করা হলে যে সমস্ত সমস্যা দেখা দেয়ঃ

১) ইসতিওলা অর্থ বল প্রয়োগ করে কোন বস্তুর মালিকানা হাসিল করা। তাই استوى (ইসতিওয়া)এর অর্থ استولى (ইসতিওলা)এর মাধ্যমে করা হলে অর্থ দাঁড়ায়, আকাশ-যমিন সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ আরশের মালিক ছিলেন না, পরে শক্তি প্রয়োগ করে মালিকানা হাসীল করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

إِنَّ رَبَّكُمْ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ

“নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক হলেন সেই আল্লাহ যিনি ছয় দিনে আকাশ এবং জমিন সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপরে সমুন্নত হলেন।” (সূরা আরাফঃ ৫৪)

২) الرحمن على العرش استوى“র্আ-রাহমানু আ’লাল আরশিস্ তাওয়া” অর্থ যদি ইস্তাওলার মাধ্যমে করা শুদ্ধ হয় তাহলে একথাও বলা শুদ্ধ হবে যে, (الله استوى على الأرض) অর্থাৎ আল্লাহ জমিনের অধিকারী হয়ে গেলেন। এমনিভাবে অন্যান্য মাখলুকাতের ক্ষেত্রেও একই ধরণের কথা প্রযোজ্য। এ ধরণের অর্থ আল্লাহর শানে শোভনীয় নয়।

৩) এটি আল্লাহর বাণীকে তার আপন স্থান থেকে সরিয়ে দেয়ার শামিল।

৪) এ ধরণের অর্থ করা সালাফে সালেহীনের ইজমার পরিপন্থী। তাওহীদুল আসমা ওয়াস্ সিফাতের ক্ষেত্রে মূল কথা এই যে, আল্লাহ নিজের জন্য যে সমস্ত নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করেছেন, কোন পরিবর্তন, বাতিল বা ধরণ-গঠন কিংবা দৃষ্টান্ত পেশ করা ছাড়াই তার প্রকৃত অর্থের উপর ঈমান আনয়ন করা আমাদের উপর ওয়াজিব।

—আব্দুল্লাহ শাহেদ ২২ অগাস্ট ২০১১, রাত ০১:৫৫ 

Share this nice post:
Profile photo of admin

Written by

Filed under: আক্বীদা / ঈমান, তাওহীদ / শীরক

Leave a Reply

Skip to toolbar